মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়: বাংলাদেশ ব্যাংক

Sadek Ali
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:০১ অপরাহ্ন, ৩০ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১২:২২ পূর্বাহ্ন, ০১ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

 জুলাই-ডিসেম্বর মুদ্রানীতিতে পলিসি রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশই থাকছে

 ২০২৭ সালে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা

আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

 বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে প্রবৃদ্ধি ৬.৮ শতাংশ

 ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল বিতরণে খাতওয়ারি বিভাজন

আরও পড়ুন: আবারও কমলো সোনার দাম

 বেসরকারি খাতের জন্য বিদেশি ঋণ সহজীকরন    

বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা সহজলভ্য করতে চায় না। অর্থাৎ নীতি সুদহার কমাতে রাজি নয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক; যাতে ব্যাংকগুলো টাকা ধার চাইলে আগের মতোই ১০ শতাংশ হারে উচ্চ সুদ পরিশোধ করতে হয়। এর দুটি উদ্দেশ্য। প্রথমটি হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাতে অন্তত বিদ্যমান অবস্থা থেকে আরও না বাড়ে। দ্বিতীয়টি হলো ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের শিল্প এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি ঋণের দিকে উৎসাহিত করা। আর এজন্যই বেসরকারি খাতে স্থানীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির মাত্রা ৬.৮ শতাংশে রেখে জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই মুদ্রানীতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৭ সাল নাগাদ মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান ৯.৪৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নিয়ে আসার পাশাপাশি সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ অর্জনে সহযোগিতা করতে চায়।

গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, মুদ্রানীতি এককভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এজন্য অন্যান্য অনুসঙ্গ বা প্যারামিটার যেমন অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প অর্থের উৎস উম্মোচন, বাজার সিন্ডিকেট দমনসহ সরকারের নানা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডও উতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সরকারের সঙ্গে কথা বলেই এই মুদ্রানীতি দেয়া হচ্ছে।  

এ সময় ডেপুটি গভর্নরের বক্তব্য সমর্থন করে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, সরকারের দেয়া ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের কার্যকর ব্যবহারের পাশাপাশি বিকল্প অর্থায়নের উৎস হিসেবে বৈদেশিক ঋণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে এদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানা পরিচালনা করছে এমন বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য প্যারেন্ট কোম্পানি থেকে ঋণ আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুর্বানুমতির বিষয়টাও বাতিল করা হবে। এছাড়া স্থানীয় বেসরকারি উদ্যোক্তারাও যাতে বিদেশি ঋণ পায় সে ব্যাপারেও সহযোগিতা করা হবে।

মুদ্রানীতির বিবরণ দিতে গিয়ে ডেপুটি গভর্নর জানান, ৬০ (ষাট) হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঅর্থায়ন তহবিল থেকে যোগান দেয়া হবে। এই তহবিলের ২০ (বিশ) হাজার কোটি টাকা দেয়া হবে শিল্প, ব্যবসা ও সেবা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা ও উৎপাদন পুণরায় চালু করতে; ১০ (দশ) হাজার কোটি টাকা পাবে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে; ৫ (পাঁচ) হাজার কোটি টাকা পাবে সিএমএসএমই খাত; ৩ (তিন) হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হবে রপ্তানি বহুমূখিকরন খাতে এবং আরও ৩ (তিন) হাজার কোটি টাকা নর্থ-বেঙ্গল কৃষি হাব  (কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠা করতে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে যে ১৯ হাজার কোটি টাকা দিবে তার মধ্যে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইনান্সিং বাবদ ৫ (পাঁচ) হাজার কোটি টাকা; কটেজ ও মাইক্রো এন্ট্রাপ্রেনার্স ৫ (পাঁচ) হাজার কোটি টাকা; চামড়াজাত পণ্য এবং জুতা রপ্তানি খাতে ২ (দুই) হাজার কোটি টাকা; হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানিতে ২ (দুই) হাজার কোটি টাকা; বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে ১ (এক) হাজার কোটি টাকা; সবুজ (গ্রীন) ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে ১ (এক) হাজার কোটি টাকা; স্টার্টআপ তহবিল ৫০০ কোটি টাকা এবং সৃজনশীল অর্থনীতি খাতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এর মাধ্যমে আগামী ৬ মাসের মধ্যে অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার হবে। তিনি এসময় জানান, ২০২৪ এর ৫ আগস্টের আগে এবং পরে দুই ধরনের সমস্যা ও ঝুঁকি তৈরি হয়। একদিকে ঋণের উচ্চসুদ দিতে হচ্ছে; অপরদিকে আমানতের বিপরীতে আশানুরূপ মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে না। গভর্নর বলেন, এই সমস্যা নিরসনে সুদের হারে ব্যবধান কমানো হয়েছে। বর্তমানে এটি ৪ শতাংশ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এছাড়াও আগস্ট পরবর্তীতে কিছু ব্যাংকের কাছে হঠাৎ করেই এক্সেস লিকুইডিটি চলে আসে। ওই টাকায় তারা সরকারের সিকিউরিটিজ কিনে অতিরিক্ত মুনাফাও নিয়ে গেছে। আমি এসে এটা চেক দিয়েছি।   

সিটি গ্রুপ ইস্যু: এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর স্বীকার করে বলেন, সিটি গ্রুপের বিষয়টা আমরা দেরীতে জেনেছি। প্রায় ২৪ (চব্বিশ) হাজার কোটি টাকার দায় সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে ২৯টি ব্যাংক জড়িত। নেতৃস্থানীয় ব্যাংকের মধ্যে ৩-৪টি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহিদের সঙ্গে আমি নিজে কথা বলছি, নিয়মিত আলোচনা করছি যাতে একটি উত্তরণের পথ তৈরি হয়। ব্যাংকগুলো নিজেরা আমাকে একটা পরিকল্পনা জানিয়েছে। সমস্যাটা মুলত বিনিময় হারের উঠানামা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। আশা করি আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে এই সমস্যা তারা কাটিয়ে উটতে পারবে।

ইসলামী ব্যাংক ইস্যু: এ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, আমরা এযাবত ইসলামী ব্যাংককে মোট ১৩  (তের) হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছি। ব্যাংকটি যাতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে পারে। অন্তর্বতী সরকার এই ব্যাংককে দিয়েছিল ১৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকা; আর আগের বছর পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার দিয়েছিল ২৫ (পঁচিশ) হাজার কোটি টাকা।  

বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বর্তমানে স্থিতিশীল আছে দাবী করে গভর্নর বলেন, আমাদের রেমিট্যান্স এক্ষেত্রে একটি বড় শক্তি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও এখন ভালো এবং তা প্রায় ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিব জানান, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যলেন্স আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে। এখন প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন উদ্বৃত্ব আছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই শীর্ষ কর্মকর্তারা আরও জানান, জ্বালানি ঘাটতি, দুর্বল বিনিয়োগ চাহিদা এবং মূল্যস্ফীতি এখনও আমাদের অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি হিসেবেই রয়ে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি মূল্যস্ফীতি যেনো দ্বিতীয় ধাক্কা না দেয়।

তারা জানান, নতুন মুদ্রানীতির মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমিয়ে আনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির মন্দা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করা হবে। আশু ফলাফল হিসেবে আমরা পেতে পারি ব্যবসায় আস্থা ফিরে আসা, শিল্প পূনর্জাগরণ, ২৫ লাখ প্লাস কর্মসংস্থান, রপ্তানি পুণরুদ্ধার এবং রেমিট্যান্স ও জিডিপিতে ভালো প্রবৃদ্ধি।