স্থানীয় ভোটে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনগত যোগ্যতাই মুখ্য: ইসি সচিব
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নয়, বরং আইন অনুযায়ী তার প্রার্থিতার যোগ্যতা-অযোগ্যতাই নির্বাচন কমিশনের বিবেচ্য বিষয় বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নির্বাচন পরিচালনা করা; প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় কমিশনের কাছে গৌণ। আইনগত শর্ত পূরণ করলে যে কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক প্রস্তুতি কমিশনের রয়েছে এবং সরকারের সিদ্ধান্ত পেলেই ন্যূনতম ৪৫ দিনের সময় নিয়ে তফসিল ঘোষণা করা সম্ভব।
রোববার নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, আচরণবিধি, প্রার্থিতার যোগ্যতা এবং নির্বাচন প্রস্তুতি বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
আরও পড়ুন: নির্বাচনী দায়িত্বে প্রাণহানি হলে ১০ লাখ টাকা অনুদান, ইসির নতুন সুরক্ষা নীতিমালা
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আখতার আহমেদ বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে তা নির্বাচন কমিশনের বিবেচ্য বিষয় নয়। কমিশনের কাছে মুখ্য হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইন অনুযায়ী প্রার্থী হওয়ার যোগ্য কি না।
তিনি বলেন, “আমি নির্বাচনের প্রার্থীকে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখি। প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় আমার কাছে গৌণ। প্রার্থিতার ক্ষেত্রে আইনগত যোগ্যতা ও অযোগ্যতাই মুখ্য বিষয়। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে তিনি প্রার্থী হবেন, আর শর্ত পূরণ না করলে প্রার্থী হতে পারবেন না।”
আরও পড়ুন: স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি এগোচ্ছে, কমিশন সভার অপেক্ষায় ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয়কে বিবেচনায় নেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবেও তিনি একই অবস্থান তুলে ধরে বলেন, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের বিধান অনুসারেই প্রার্থিতা যাচাই করবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে ইসি সচিব বলেন, নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক উপকরণ কমিশনের কাছে রয়েছে। ভোটার তালিকা, ভোটকেন্দ্র, নির্বাচনী সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, “একটা নির্বাচন করতে গেলে যে উপাত্তগুলো প্রয়োজন, সেগুলো আমাদের কাছে আছে। ভোটার তালিকা আছে, ভোটকেন্দ্র আছে, নির্বাচনী সামগ্রী আছে। এখন সময়সূচি নির্ধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু কাজ রয়েছে, সেগুলো নির্ধারিত সময় অনুযায়ী করা হবে।”
তিনি জানান, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ক্যাসকেডিং মডেলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। প্রথমে মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করা হবে, পরে তারা মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেবেন।
এছাড়া নির্বাচনকে আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করতে মক রিহার্সাল ও মক ভোটিং আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
আখতার আহমেদ বলেন, “আমরা কিছু মক রিহার্সাল করব। এবার মক ভোটিংও করব, যাতে নির্বাচন আরও সুন্দর, সুষ্ঠু ও অর্থবহ হয়।”
নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের কাছে আসেনি। তবে সিদ্ধান্ত পাওয়া মাত্র কমিশন তার কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে।
তিনি বলেন, “আমাদের কাজের তালিকা প্রস্তুত আছে। নির্বাচন কবে হবে, সেই সিদ্ধান্ত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করব।”
সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশনের প্রধান প্রয়োজন একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি।
তার ভাষায়, “একটি নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমাদের ন্যূনতম ৪৫ দিনের শিডিউলিং প্রয়োজন। সেই সময় পাওয়া গেলে সেপ্টেম্বর হোক বা অক্টোবর, আমরা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারব।”
আচরণবিধি চূড়ান্ত করার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হচ্ছে। এসব মতামত পর্যালোচনা করে একটি তুলনামূলক কর্মপত্র তৈরি করা হবে। পরে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে কোন প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে এবং কোনটি হবে না।
তিনি বলেন, “আচরণবিধির কাজ শেষ হলে পরিচালনা বিধিমালার কাজ শুরু হবে। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব এ কাজগুলো শেষ করতে, যাতে বাকি প্রস্তুতির জন্য বেশি সময় পাওয়া যায়।”
প্রার্থীদের অঙ্গীকারনামা বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আখতার আহমেদ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিধান থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের খসড়ায় তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে এ বিষয়ে কমিশন এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ থাকা অবস্থায় নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে ইসি সচিবের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কমিশন এখনো সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলেও নির্বাচন আয়োজনের প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রস্তুতি এগিয়ে রাখছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে আইনগত যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রার্থী বাছাইয়ের নীতি অনুসরণের ইঙ্গিত দিয়েছে।





