দেশে হঠাৎ করেই হাম ছড়াচ্ছে কিভাবে
হাম একটি অতিসংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের আক্রান্ত করে। সঠিক সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে। সম্প্রতি টিকাদান কর্মসূচির ব্যাপকতা বাড়লেও অসচেতনতার কারণে অনেক শিশু এখনো হামের ঝুঁকিতে রয়েছে।
হাম মূলত ‘মরবিলিভাইরাস’ (Morbillivirus) গোত্রের ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি সংক্রমণ। (উল্লেখ্য যে, হাম বা মিজলস এবং রুবেলা দুটি ভিন্ন ভাইরাস হলেও এদের উপসর্গ কাছাকাছি এবং বাংলাদেশ সরকারের ইমিউনাইজেশন প্রোগ্রামে এদের একত্রে 'এমআর' টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা হয়)। এই ভাইরাসটি সাধারণত শ্বাসনালির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে দুর্বল করে দেয়। ফলে আক্রান্ত শিশু সহজেই অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
আরও পড়ুন: সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২২ শিশুর মৃত্যু
উপসর্গ ও লক্ষণসমূহ
হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণত সংক্রমণের ১০ থেকে ১২ দিন পর প্রকাশ পায়:
আরও পড়ুন: টিকাবঞ্চিত শিশু নিয়ে বিভ্রান্তি: পুরোনো তথ্য ব্যবহারে সতর্ক করল ইউনিসেফ
তীব্র জ্বর এবং অনবরত কাশি।
নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া।
জ্বর শুরুর প্রায় চার দিন পর মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে র্যাশ বা দানা দেখা দেওয়া।
হামের জটিলতা: অবহেলা যেখানে বিপদের কারণ
হাম শুধু একটি সাধারণ জ্বর নয়; এর ফলে শরীরে নানা রকম দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন:
নিউমোনিয়া এবং মারাত্মক ডায়রিয়া।
কান পাকা বা কানের সংক্রমণ।
মুখে ঘা এবং পুষ্টিহীনতা।
মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কীভাবে ছড়ায়?
হামের ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে বাতাসে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমিত স্থানে সুস্থ শিশু শ্বাস নিলে বা সরাসরি সংস্পর্শে আসলে মুহূর্তেই আক্রান্ত হতে পারে। এর ফলে জনবহুল এলাকায় এটি দ্রুত মহামারি আকার ধারণ করার ক্ষমতা রাখে।
টিকাদান: সুরক্ষার প্রধান হাতিয়ার
বাংলাদেশে বর্তমানে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের দুই ডোজ ‘এমআর’ (মিজলস রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৮৮ শতাংশ শিশু এই দুই ডোজ টিকার আওতায় এসেছে, যা তাদের জীবনভর হামের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়।
টিকা দেওয়ার পরও কেন হাম হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা না গেলে প্রাদুর্ভাব ঠেকানো কঠিন। অনেক শিশু একটি ডোজ নিয়ে দ্বিতীয়টি নিতে কেন্দ্রে যায় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি না হলে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার সামান্য সম্ভাবনা থাকে। তবে টিকা নেওয়া থাকলে রোগের তীব্রতা ও প্রাণহানির ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
আক্রান্ত হলে করণীয়
১. চিকিৎসকের পরামর্শ: জ্বর ও র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
২. বিচ্ছিন্ন রাখা: র্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত ৫ দিন আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা (আইসোলেশন) রাখতে হবে।
৩. পুষ্টি ও যত্ন: স্বাভাবিক খাবার ও পর্যাপ্ত পানীয় নিশ্চিত করতে হবে।
৪. ভিটামিন এ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন-এ ক্যাপসুল নির্দিষ্ট ডোজে খাওয়াতে হবে, যা চোখের ক্ষতি ও জটিলতা কমায়।





