দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ইরান, যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনাগ্রহের ইঙ্গিত
ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা সবসময় জোর দিয়ে বলেন যে, দেশটি দীর্ঘমেয়াদি মুখোমুখি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত এবং এই বার্তা দিয়েই তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য ধৈর্য ও প্রস্তুতির একটি চিত্র তুলে ধরতে চান।
গত দোসরা মার্চ, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি ঘোষণা করেন যে, ইরান একটি দীর্ঘ সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আরও পড়ুন: আগামী সপ্তাহের মধ্যে ইরানে কঠোর আঘাত হানার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
"ইরান, আমেরিকার মতো নয়, দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে," আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছিলেন তিনি।
দেশটির কর্মকর্তারা আরও বলেছেন যে, "আগ্রাসনের" বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিক্রিয়া নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমায় সীমাবদ্ধ নয়, যা ইঙ্গিত করে যে সংঘাত কয়েক মাস বা তার চেয়েও দীর্ঘকাল চলতে পারে।
আরও পড়ুন: মালদ্বীপে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৫ বাংলাদেশি নিহত
সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ গত ৮ই মার্চ বলেন, "আমরা অবশ্যই যুদ্ধবিরতি চাইছি না। আমাদের আক্রমণকারীকে শাস্তি দিতেই হবে"। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে একটি অস্তিত্বগত যুদ্ধে লিপ্ত।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালায়েনিকও বলেছেন, ইরান "আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা" শত্রুর প্রত্যাশার চেয়ে বহু গুণ বেশি সময় ধরে বজায় রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে তার অস্ত্র ব্যবহারের ধাপগুলো ভাগ করে চালাচ্ছে—অর্থাৎ সব সক্ষমতা একসঙ্গে নয়, বরং আরও উন্নত সক্ষমতার কিছু অংশ পরবর্তী পর্যায়ের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
ইরানের কৌশল কী?
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ইরান এমন একটি কৌশলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ইরানি বাহিনী ধারাবাহিকভাবে বা ধাপে ধাপে ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করছে এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্বার্থের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করছে।
এ ধরনের হামলার কয়েকটি লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, এগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বাধ্য করে আগত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্রিয় হতে। প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো এসব ব্যবস্থা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সীমিত সংখ্যক, এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিরোধই ধ্বংস করা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের তুলনায় বেশি ব্যয়সাপেক্ষ।
দ্বিতীয়ত, ধারাবাহিক হামলা দেশগুলোর প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক ও সামরিক প্রস্তুতিকে চাপে ফেলতে পারে।
ওয়াশিংটন পোস্ট–এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী লড়াইয়ের প্রথম সপ্তাহেই দ্রুতগতিতে সুনির্দিষ্ট অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। অন্যান্য বিশ্লেষকরা বলেন, অতিরিক্ত অস্ত্র ব্যবহারের এই মাত্রা "সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতা" উন্মোচিত করছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের অস্ত্র সরবরাহ অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং সশস্ত্র বাহিনী "বর্তমান গতিতে অন্তত ছয় মাস তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে"।
কয়েকজন কমান্ডার আরও বলেছেন, ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে দেশীয়ভাবে হয় এবং একাধিক উৎপাদন কেন্দ্র ও বড় মজুত থাকার কারণে ইরান দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালাতে সক্ষম।
ইরান মনে হচ্ছে সময় ধরে হামলাগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে, যাতে প্রতিপক্ষকে হঠাৎ, সিদ্ধান্তমূলক কোনো বৃহৎ আক্রমণের মুখে পড়ার বদলে একটানা প্রতিরক্ষা বজায় রাখতে হয়। এই কৌশলটি একটি বৃহত্তর সামরিক মতবাদের প্রতিফলন, যা ইরান কয়েক দশকের মধ্যে বৃহত্তর শক্তিধর দেশগুলোর সামরিক সুবিধা মোকাবিলায় গড়ে তুলেছে।
১৯৮০–এর দশকের ইরান–ইরাক যুদ্ধের পর ইরান অসম যুদ্ধ কৌশলে ব্যাপক বিনিয়োগ করে।
এই পদ্ধতি এমন সরঞ্জাম ও কৌশলের ওপর গুরুত্ব দেয়, যা প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের ওপর নির্ভর না করেই শক্তিশালী বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম। লক্ষ্য সবসময় শক্তিশালী শত্রুকে সরাসরি পরাজিত করা নয়, বরং যেকোনো সামরিক সংঘাতকে ব্যয়বহুল, দীর্ঘস্থায়ী ও অনিশ্চিত করে তোলা।
অর্থনৈতিক পরিণতি কী?
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ইরানের অভ্যন্তরে এবং বৈশ্বিকভাবে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি ভোক্তা পর্যায়ে এবং ব্যবসার জন্যও বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করছে।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সাধারণত হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, তবে যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর সরু এই জলপথে চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে গেছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আকাশসীমা বন্ধ থাকায় অঞ্চলের বাণিজ্য রুটগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের ভেতরের অর্থনীতিও চাপের মুখে। বহু বছরের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতি এখন সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, মুদ্রার অস্থিতিশীলতা এবং যুদ্ধের কারণে বাণিজ্য ও সেবায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় আরও চাপের সম্মুখীন।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, সংঘাত অব্যাহত থাকলে তা গুরুতর অর্থনৈতিক সংকোচন এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা দেশের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
যুদ্ধকালীন প্রতিরক্ষা ও সমাবেশে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে ইরানি কর্তৃপক্ষ জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেছে, একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ সমর্থন বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক ঝুঁকি কী?
সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকিও তত বাড়বে।
ওই অঞ্চলের দেশগুলো, বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো, বৃহত্তর যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং কিছু দেশ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছে। তবে ইরান বলছে তারা এসব দেশে "আগ্রাসী সম্পদ ও ঘাঁটিকে" লক্ষ্যবস্তু করছে।
একইসঙ্গে, চলমান সংঘাত আঞ্চলিক জোটের বিন্যাস বদলে দিতে পারে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে ইরানের প্রতিপক্ষে ঠেলে দিতে পারে।
ইরানের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মানে সামরিক কৌশল, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চ্যালেঞ্জ হতে পারে ক্ষয়ক্ষতির এই লড়াই চালিয়ে যাওয়া। একদিকে সামরিক অভিযান বজায় রাখা; অন্যদিকে বৈশ্বিক আর্থিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা করা।





