নারী আসন নিয়ে বিএনপিতে আলোচনা, মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে শাহীনুর বেগম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর পর রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন। আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে এসব আসনে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে, ফলে দলীয় মনোনয়ন ঘিরে বিএনপির নারী রাজনীতিতে সরব তৎপরতা দেখা গেছে।
দলীয় সূত্র বলছে, মনোনয়ন দৌড়ে মহিলা দলের পাশাপাশি অতীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল-এ সক্রিয় থাকা নেত্রীরা এগিয়ে রয়েছেন। আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী অ্যাডভোকেট শাহীনুর বেগম। বর্তমানে তিনি জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল-এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন।
আরও পড়ুন: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রায় তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন শাহীনুর বেগম। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তিনি একাধিকবার হামলা, মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন বলে দলীয় নেতারা জানান।
২০০৭ সালের সেনাশাসন-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী রাজনৈতিক পর্বে হরতাল, মিছিল ও আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে তিনি বহুবার বাধার সম্মুখীন হন। ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন ঘটনায় তিনি ও তার সহযোদ্ধারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও হত্যা মামলায় জড়ানোর ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশিদের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
১৯৯৫ সালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ি শাহীনুর বেগমের। ১৯৯৯ সালে নোয়াখালীর সোনাপুর কলেজ ছাত্রদলের সহ-ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। এরপর ২০০১ সাল থেকে ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রদলের প্রথম যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তিনি জাতীয়তাবাদী আইন ছাত্র ফোরামের সহসভাপতির দায়িত্বে আসেন ২০১০ সালে। একই বছর ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য হন। ২০১২ সালে সহ-ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক ও ২০১৪ সালে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি।
ছাত্রদলের রাজনীতি ছেড়ে শাহীনুর বেগম যুক্ত হন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলে। ২০২২ সালে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকার দায়িত্ব পালন করেন। পরের বছর স্বেচ্ছাসেবক দলের মুখ্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। বর্তমানে ঢাকা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের সহকারি পাবলিক প্রসিকিউটর তিনি।
জানা গেছে, ঈদের আগেই সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট প্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে ৯০ দিনের মধ্যে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমান আসন বণ্টন অনুযায়ী, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিএনপি একাই ৩৫-৩৬টি আসন পেতে পারে। বিএনপি থেকে নারী আসনে এমপি হতে এগিয়ে রয়েছেন বারবার নির্যাতিত নারীনেত্রী শাহীনুর বেগম। ২০১৮ সালে নোয়াখালী-৪ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি।
জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক দল নেত্রী শাহীনুর বেগম বলেন, ‘দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় রাজপথে আছি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সামনের সারি থেকে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি জীবন বাজি রেখে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও দেশনায়ক তারেক রহমানের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থেকে কখনো আন্দোলনের মাঠ ছেড়ে যাইনি। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে সরাসরি নির্বাচনে। তখন দিনের ভোট রাতে হয়েছে ফ্যাসিবাদ কায়েম করার জন্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘মামলা খেয়েছি, পরিবারকে অনেক বেশি বিপদে ফেলেছি। বাবা-মা, বড় ভাই ও মামলার আসামি হয়েছে আমার জন্য। অবশ্য আজ ওনারা তিনজনের একজনও দুনিয়াতে নেই। আমার সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান অবশ্যই মূল্যায়ন করবে বলে আমি বিশ্বাস করি ইনশাআল্লাহ।’
জানা গেছে, ২০১০ সালে ঢাকা সেনানিবাসের বাড়ি থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রোষানলে পড়েন শাহীনুর বেগম। ওই বছরেই বিএনপির ডাকা হরতালে পিজি হাসপাতালের সামনে তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে পুলিশ ও ছাত্রলীগ। তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ইডেন কলেজের সামনে মিছিল ও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার কারণে গ্রেপ্তার হন। ২০১১ সালের ৫ জুন হরতালের সমর্থনে মিছিল করতে গেলে থানায় নিয়ে তাকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে পুলিশ। ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মিছিল করতে গেলে আবারও পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি।
২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়া আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার সময় হাইকোর্ট এলাকায় তার গাড়ির সামনে থেকে পুলিশ টেনে নিয়ে পিটিয়ে ডান হাতের ৩টি আঙ্গুল ভেঙ্গে দেয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়াকে মামলায় অবৈধ সাজা দেওয়ার দিন কাকরাইলে গুলিবিদ্ধ হন। ওই বছরের ১৯ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে কাজ করতে গিয়ে নিজ এলাকা সুবর্ণচরে হামলার শিকার হন। ২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
একইভাবে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ১৬ জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট প্রতিদিন মিরপুর এলাকায় আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন শাহীনুর বেগম। তিনি আহত হন এবং জীবনঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান।





