সুন্দর নির্বাচন হলেও আপত্তি ওঠে ভোটের পর : সিইসি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে একটি বাস্তবতা হলো—যখন নির্বাচন ভালো ও শান্তিপূর্ণ হয়, তখন ভোট শেষ হওয়ার পরই বিভিন্ন ধরনের আপত্তি ও অভিযোগ সামনে আসে। তবে এবারের নির্বাচনে তিনি এখন পর্যন্ত এমন একজন মানুষও পাননি, যিনি অভিযোগ করেছেন যে তিনি ভোট দিতে পারেননি।
তিনি বলেন, “আমি শত শত মানুষকে জিজ্ঞেস করেছি—আপনি কি ভোট দিতে পারেননি? কেউ বলেননি যে ভোট দিতে পারেননি। বরং অনেকে গর্ব করে আঙুলের কালি দেখিয়েছেন। আমার নিজের আঙুলেও এখনও কালি রয়ে গেছে।”
আরও পড়ুন: কমলাপুর স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের ভিড়, টিকিট কেটেও সিট না পাওয়ার অভিযোগ
শনিবার ( ১৬ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নির্বাচন কমিশনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন সিইসি।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জাতির কাছে দেওয়া একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নানা-নানির কবর জিয়ারত করলেন
‘জাতির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরেছি’
সিইসি বলেন, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করেছেন।
তার ভাষায়, “আমরা জাতির কাছে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম—একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়ার। আমি মনে করি, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই ওয়াদা আমরা রক্ষা করতে পেরেছি। এজন্য নির্বাচন কমিশনের সহকর্মী, গণমাধ্যম এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।”
তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করে তিনি কোথাও বড় ধরনের কোনো সমস্যা দেখেননি। নারী, বয়স্ক কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো বাধার অভিযোগ তার কাছে আসেনি।
সংখ্যালঘু ধারণায় আমি বিশ্বাস করি না:
নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি “সংখ্যালঘু” ধারণায় বিশ্বাস করেন না।
তিনি বলেন, “আমরা যদি সবাই বাংলাদেশি হই, তাহলে সংখ্যালঘু কিসের? আমরা তো একই জাতির মানুষ। আইনের চোখে সবাই সমান, সবার সমান অধিকার ও সুযোগ থাকা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, তারা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছেন।
ভোটের পর আপত্তি ওঠা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি:
সিইসি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে—১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী অনেক নির্বাচনেই ভোটের পর অভিযোগ ও আপত্তি তোলা হয়েছে।
তার ভাষায়, “আমাদের নির্বাচন সংস্কৃতিতে এটা অনেকটা নিয়মের মতো হয়ে গেছে—ভোট শেষ হওয়ার পর আপত্তি ওঠে। কিন্তু নির্বাচন ভালো হলে সাধারণত বড় ধরনের আপত্তি দেখা যায় না।”
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, সম্প্রতি বিদেশে অবস্থানকালে অন্য একটি দেশের নির্বাচন নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ উঠতে দেখেছেন।
নারীদের অবদান ‘অদৃশ্য অর্থনীতি’
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রসঙ্গ টেনে সিইসি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে নারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
তিনি বলেন, “একজন গৃহিণী সন্তান লালন-পালন করেন, পরিবারের সব কাজ করেন। কিন্তু এসব কাজের কোনো আর্থিক মূল্য আমরা হিসাব করি না। যদি এই অবদানকে অর্থমূল্যে হিসাব করা হতো, তাহলে বাংলাদেশের জিডিপি অন্তত তিনগুণ হয়ে যেত।”
তার মতে, গৃহস্থালি কাজ, শিশু লালন-পালন ও পরিচর্যার মতো কাজগুলো জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সেগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।
নারী শ্রমেই দাঁড়িয়ে আছে অর্থনীতির বড় অংশ
সিইসি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাত নারীদের শ্রম ও অংশগ্রহণের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
তিনি উল্লেখ করেন—তৈরি পোশাক শিল্প
বিদেশে গৃহকর্মী ও সেবাখাতে কর্মরত নারী শ্রমিক
স্বাস্থ্য ও নার্সিং পেশা, এসব ক্ষেত্রেই নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ নারীদের শ্রম ও অবদানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই নারীদের অবদান খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।”
নারী ভোটার বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ:
সিইসি জানান, আগে পুরুষ ও নারী ভোটারের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখের মতো ব্যবধান ছিল। নির্বাচন কমিশনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনার ফলে সেই ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
তিনি বলেন, “আমরা এই ব্যবধান প্রায় ১০ লাখে নামিয়ে আনতে পেরেছি। ভবিষ্যতে এই ব্যবধান আরও কমে আসবে বলে আশা করছি।”
তিনি আরও জানান, ভোটার নিবন্ধনের সময় অনেক নারীকে রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। “এই দৃশ্যের ছবি আমি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও পাঠিয়েছি। নারীদের এই আগ্রহ আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক বার্তা,” বলেন তিনি।
নারীদের নেতৃত্ব দ্রুত বাড়ছে:
সিইসি বলেন, বাংলাদেশে এখন প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব বাড়ছে।
তিনি বলেন, চিকিৎসা, প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষা ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
তার ভাষায়, বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ নিয়ে বাইরে অনেক সময় নেতিবাচক প্রচারণা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি অনেক ভালো। অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখন এগিয়ে গেছে।





