সিলেটি কন্যার বিশ্বজয়!

কানাডার এমপি হলেন বাংলাদেশি ডলি বেগম

Sanchoy Biswas
সৈয়দ তারেক হাসান
প্রকাশিত: ৬:৪৯ অপরাহ্ন, ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৬:৫১ অপরাহ্ন, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আটলান্টিকের ওপারে বরফশুভ্র দেশ কানাডায় এবার রচিত হলো লাল-সবুজের এক অনন্য ইতিহাস। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে কানাডার ফেডারেল উপ-নির্বাচনে টরন্টোর ‘স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট’ আসন থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডলি বেগম।

Liberal Party of Canada-এর প্রার্থী হিসেবে ডলি বেগম ২৮,৭৭৮টি বৈধ ভোটের মধ্যে ২০,১১৪ ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে বিজয়ী হন। সব মিলিয়ে ১৮৮টি কেন্দ্রের ফলাফল প্রকাশের পর তার জয় নিশ্চিত হয়। ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩৩.৫৪ শতাংশ।

আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ

মৌলভীবাজারের মনু নদের পাড় থেকে উঠে আসা এই অদম্য নারীর সাফল্যে উচ্ছ্বসিত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বিশ্লেষকদের মতে, তার এই জয় শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং কানাডার বহুসাংস্কৃতিক রাজনীতিতে অভিবাসী প্রতিনিধিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

মৌলভীবাজার জেলার মনুমুখ ইউনিয়নের বাজরাকোনা গ্রামের সাধারণ এক পরিবারে জন্ম নেওয়া ডলি বেগমের শৈশব কেটেছে মনু নদের হাওয়ায়। মাত্র ১২ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে কানাডায় পাড়ি জমান তিনি।

আরও পড়ুন: জিরো ওয়েস্ট ক্যাম্পেইন: ১৭ দিনের কর্মসূচি শেষ করলো প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন

সেখানে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে লন্ডনের বিশ্বখ্যাত ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) থেকে উন্নয়ন প্রশাসন ও পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি দ্য সোসাইটি অব এনার্জি প্রফেশনালসে এনালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনে যুক্ত রয়েছেন।

নতুন দেশে থিতু হওয়া থেকে শুরু করে রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছানোর পথটি সহজ ছিল না। তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় এবং শিক্ষার আলো তাকে সামনে এগিয়ে নিয়েছে বলে ঘনিষ্ঠরা জানান।


ফলাফল ঘোষণার পরপরই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ আর আবেগের ঢেউ। সমর্থক, পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীরা একত্রিত হয়ে উদযাপন করেন এই গৌরবময় মুহূর্ত। অনেকের চোখে ছিল আনন্দাশ্রু, আবার কারও কণ্ঠে ছিল গর্বের সুর।

সিলেট ব্যুরো প্রধান জুলফিকার তাজুলের বরাতে জানা যায়, স্থানীয়ভাবে মিষ্টি বিতরণ ও আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে ডলি বেগমের বিজয় উদযাপন করা হয়।

অন্যদিকে ডলি বেগমের চাচা আব্দুস শহীদ বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা রাজা মিয়া ২০০১ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। সেই সময় পরিবারকে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। ছোট ভাই মহসিন মিয়াকে নিয়ে ডলি বেগমকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “ডলি বেগমের বিজয়ে আজ পুরো সিলেটবাসী গর্বিত। ডলি বেগম সিলেটের অহংকার।”

মনুমুখ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ ইমরান সাজু বলেন, আমার ইউনিয়নের একটি মেয়ে কানাডার সংসদে পৌঁছানো আমাদের সিলেট তথা পুরো দেশের জন্য গর্বের বিষয়। আমরা ইউনিয়নবাসী অত্যন্ত আনন্দিত। তার বিজয়ে পুরো মনুপাড়ে আনন্দের জোয়ার বইছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিজয় শুধু একটি আসন জয় নয়, বরং কানাডার রাজনৈতিক পরিসরে অভিবাসী নেতৃত্বের প্রতি আস্থার প্রতিফলন। ডলি বেগম তার বক্তব্যে বলেন, তিনি শুধু সমর্থকদের নয়, বরং সকল মানুষের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করতে চান এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেন।

ডলি বেগমের এই অর্জন প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক শক্তিশালী উদাহরণ। তার এই জয় শুধু আজকের নয়, বরং আগামী দিনের পথচলারও একটি বার্তা- স্বপ্ন, পরিশ্রম আর অধ্যবসায় থাকলে সীমা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।