স্থাপনা ও কর্মীদের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে নাশকতার আশঙ্কায় সতর্কতা

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:১৭ অপরাহ্ন, ১৩ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৮:১৭ অপরাহ্ন, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

হঠাৎ করেই সারা দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকটে বিক্ষুব্ধ জনতার টার্গেটে পরিণত হয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস কর্মীরা। বিদ্যুতের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও বিদ্যুৎ কর্মীদের আটকে রাখায় মারধরের খবর পাওয়া গেছে। দেশের গ্রামাঞ্চলে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এদিকে সরকারের একটি সূত্র জানায়, হঠাৎ করে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটকে ইস্যু করে বিভিন্ন স্থানে নাশকতা ও মব তৈরির আশঙ্কা করছে গোয়েন্দারা। কেপিআইভুক্ত গ্যাস ও বিদ্যুতের স্থাপনা ঘিরেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এদিকে হঠাৎ করেই গ্যাস-বিদ্যুতের মারাত্মক সংকট ও এলএনজি জাহাজের ত্রুটির বিষয়টি নাশকতা কিনা, তাও খতিয়ে দেখছে।

শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও দেশের বিভিন্ন পল্লী এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও দিনে ৮-১২ ঘণ্টা, কোনো কোনো এলাকায় ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের বিক্ষোভ, বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে।

আরও পড়ুন: বহু বছর পর যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে পাচ্ছি: আসিফ নজরুল

এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ অফিস, উপকেন্দ্র ও কর্মীদের নিরাপত্তা জোরদারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমানের সই করা একটি চিঠি পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয়। পুলিশ সদর দপ্তর চিঠিটি গ্রহণ করেছে।

পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। ফলে সারা দেশে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেড়ে গেছে। কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের অফিসগুলোয় হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

আরও পড়ুন: অ্যান্ডি হলকে ৫ লাখ রিঙ্গিত ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ মালয়েশিয়ার হাইকোর্টের

দেশে বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় চার কোটি গ্রাহক পল্লী বিদ্যুতের আওতাভুক্ত। দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে এসব গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, দেশে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করা হয়।

চাহিদার তুলনায় পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিনে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ৮-৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৫-৬ হাজার মেগাওয়াট। ফলে বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

এরই মধ্যে কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ অফিসে গ্রাহকদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ১১ আগস্ট দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর করেন। এর আগে ১ আগস্ট রাতে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে স্থানীয় গ্রাহকরা আফতাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের এরিয়া অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখান। একই দিন পাবনার ঈশ্বরদীতে অসহনীয় লোডশেডিং ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর এক মিটার রিডারকে প্রায় ৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও গ্রাহকদের রোষের মুখে পড়েন।

নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় গ্রাহকদের দাবি, দিন-রাত মিলিয়ে কোনো কোনো এলাকায় সর্বোচ্চ ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে জন-অসন্তোষ বাড়ার পাশাপাশি বড় ধরনের হামলার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে পল্লী বিদ্যুতের স্থাপনা ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানানো হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবসময়ই নিরাপত্তার আওতায় থাকে। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ তবে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চিঠিটি এখনো আমরা পাইনি। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর আছে।

মহেশখালীতে জাহাজের ক্ষতির কারণে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে গেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন এলএনজি কার্গো যুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় মহেশখালীতে সামিটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।

অন্যদিকে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু থাকলেও এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। বর্তমানে টার্মিনালটি থেকে দৈনিক প্রায় ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে এর সরবরাহ সক্ষমতা ৫৫-৬০ কোটি ঘনফুট। সে হিসেবে বর্তমানে দুই টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৫৮ কোটি ঘনফুট। তবে জ্বালানি সরবরাহে এ অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকট মোকাবেলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

সংকটের কারণে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছায় দুঃখ প্রকাশ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চেষ্টার ঘাটতি নেই।’