জুলাই অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি হয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে: ডা. রফিকূল ইসলাম
জুলাই অভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্যাতন ও আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. রফিকূল ইসলাম।
বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজে আয়োজিত ‘জাগ্রত জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন: কোকোর নামে বগুড়ায় ২০ একর জমিতে জাতীয় প্যারা স্পোর্টস কমপ্লেক্স হবে: আমিনুল হক
অধ্যাপক ডা. রফিকূল ইসলাম বলেন, “হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে এক ভয়ংকর খুনি ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের পতনের পর জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন এক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। ছাত্র-জনতার এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দল-মত নির্বিশেষে স্বাধীনচেতা মানুষের দীর্ঘ ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে।”
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সূচনা ২০২৪ সালে নয়; এর শিকড় আরও অনেক গভীরে। ১/১১-এর পর গণতন্ত্র হরণ এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আওয়ামী লীগের হাতে দেশকে তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়েই এই আন্দোলনের সূত্রপাত বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, “আন্দোলন শেষ হয়েছে ২০২৪ সালে এসে, কিন্তু তার শুরুটা একযুগেরও বেশি আগের।”
আরও পড়ুন: শহীদ ডা. কবিরুল ইসলামের কন্যার এসএসসি সাফল্যে পরিবারের পাশে অধ্যাপক ডা. রফিকূল ইসলাম
বিএনপির নেতাকর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৯ সালের পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করে বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বৈরাচারী শাসন ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আন্দোলন করেছেন। এ সময়ে বহু নেতাকর্মী নিহত, গুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং অসংখ্য মামলার কারণে অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
“তাদের আত্মত্যাগই জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট প্রস্তুত করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় আবু সাঈদ, ওয়াসিম ও মুগ্ধদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা নতুন একটি বাংলাদেশ পেয়েছি,” বলেন তিনি।
দীর্ঘ সময়ে গুমের শিকার বিএনপির নেতাকর্মীদের স্মরণ করে অধ্যাপক ডা. রফিকূল ইসলাম ইলিয়াস আলী, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য চৌধুরী আলম, ছাত্রনেতা জনিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, গুমের শিকার ৬০০-এর বেশি নেতাকর্মীর কথা ভুলে গেলে চলবে না।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬৯৯ জন, গুম হয়েছেন ৬৭৭ জন এবং কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন ১ হাজার ৪৮ জন। এসব ঘটনার অধিকাংশ ভুক্তভোগী বিএনপির নেতাকর্মী বলে তিনি দাবি করেন।
এ ছাড়া ২০০৯ সালের পর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলায় ৫৯ লাখ ২৯ হাজার ৪৯২ জনকে আসামি করা হয়েছে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এত ব্যাপক নির্যাতনের নজির বিরল।
জুলাই অভ্যুত্থানে চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
জুলাই অভ্যুত্থানে চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিএনপির এই নেতা। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকদের একটি অংশ সরকারের পক্ষে অবস্থান নিলেও চিকিৎসকদের আরেকটি বড় অংশ সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে ভূমিকা রাখে।
অধ্যাপক ডা. রফিকূল ইসলাম বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানে চিকিৎসকদের বিতর্কিত ভূমিকা আমাদের ব্যথিত করে। চিকিৎসা নিয়ে গড়িমসির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে রিপোর্ট প্রদানেও চিকিৎসকদের সন্দেহজনক ভূমিকা ছিল।”
এ প্রসঙ্গে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে মুন্সিগঞ্জের শাওন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলেও তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটে গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তা প্রতিফলিত হয়নি।
এ ছাড়া ২০১৫ সালে খিলগাঁওয়ের জনি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনার কোনো ফরেনসিক রিপোর্ট বা সংশ্লিষ্ট নথি বর্তমানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
অধ্যাপক ডা. রফিকূল ইসলাম এসব নথি হারিয়ে যাওয়া বা প্রতিবেদনে অসঙ্গতির জন্য তৎকালীন সরকারের সুবিধাভোগী চিকিৎসকদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, “হত্যার জন্য পুলিশ যেমন দায়ী, ঠিক একইভাবে বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য মিথ্যা রিপোর্ট দেওয়া কিংবা নথি গায়েব করার জন্য যারা দায়ী, তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কিছু চিকিৎসক এখনও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন এবং নিয়মিত পদায়ন ও পদোন্নতি পাচ্ছেন। এসব চিকিৎসকের ভূমিকা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
“এরা এখনও আমাদের সঙ্গে, আপনাদের সঙ্গে মিশে আছে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এখন সময় এসেছে ফ্যাসিবাদী শাসনের সহযোগী ও বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্তকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার,” বলেন তিনি।
নিজের ওপর নির্যাতন ও কারাবরণের স্মৃতিচারণ
জুলাই আন্দোলন নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নিজের ওপর নেমে আসা তৎকালীন সরকারের নির্যাতন ও কারাবরণের কথাও তুলে ধরেন অধ্যাপক ডা. রফিকূল ইসলাম।
তিনি বলেন, তৎকালীন সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে একজন তৎকালীন সমন্বয়ক, যিনি পরবর্তীতে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। এ কারণে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট পুলিশ কল রেকর্ডের মাধ্যমে বিষয়টি অনুসরণ করেছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সময় অধ্যাপক ডা. মো. রফিকূল ইসলামের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, “ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বড় অন্যায় করেছে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে। তারা তাঁর চিকিৎসা ব্যাহত করেছে। তাঁকে এমন একটি স্যাঁতসেঁতে কক্ষে রাখা হয়েছিল, যেখানে বড় বড় ইঁদুর ছিল। ম্যাডাম ঘুমাতে পারতেন না।”
তিনি বলেন, “আজকে আপনাদের উপস্থিতিতে একজনের অবদান তুলে ধরব, যা কখনো বলা হয়নি। যিনি ম্যাডামের চিকিৎসার সময় সার্বক্ষণিক পাশে ছিলেন। সামনে থেকে কিংবা যেকোনো লজিস্টিক সাপোর্ট তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছি। তিনি বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. রফিকূল ইসলাম।”
বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য শতাধিক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল উল্লেখ করে বিএমইউ উপাচার্য বলেন, এমনও হয়েছে, এক রাতে ২০ ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়েছে। সে সময় ডা. রফিকূল ইসলাম রোগীর গোপনীয়তা বজায় রেখে রক্তের ব্যবস্থা করেছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পাওয়া বাংলাদেশে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মাজহারুল শাহীন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা সুমি, সহকারী অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান নোমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. নাদিম আহমেদ এবং পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিন অধ্যাপক ডা. আহমেদ সামি আল হাসান।
এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেওয়া ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এবং আন্দোলনের সময়কার বিভিন্ন স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগ স্মরণ করা হয়। পাশাপাশি গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ আন্দোলনে নিহত, গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে তাদের আত্মত্যাগকে নতুন বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়।





