সহিংসতা ছাড়াই উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন
সরকারের সার্বিক নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কারণে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই দেশজুড়ে অত্যন্ত উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পালিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। গত বছর দুর্গাপূজার সময় দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে অসুরের মুখে দাড়ি লাগানোসহ কয়েকটি ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এবার এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রতিমা তৈরির শুরু থেকেই পূজামণ্ডপগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৩৫৫। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পূজামণ্ডপ বেড়েছে ৪৯৬টি।
রাজধানী ঢাকা মহানগরে এবার ২৫৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়। এ ছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম দুর্গাপূজা উপলক্ষে নির্বাহী আদেশে ছুটি বাড়িয়ে টানা পাঁচ দিনের দীর্ঘ ছুটির ব্যবস্থা করেছে। বিজয়া দশমীর পাশাপাশি নবমী এবং বিসর্জনের পরের দিনও এর অন্তর্ভুক্ত থাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের মানুষ নির্বিঘ্নে উৎসবে শামিল হতে পেরেছেন।
আরও পড়ুন: দাম্মাম ও রিয়াদ রুটে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত
পূজার নিরাপত্তায় সারা দেশে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২ লাখ ১২ হাজার সদস্য, সাড়ে তিন হাজার কোস্টগার্ড সদস্য, ৬ হাজার এসআরবি সদস্য এবং তিন লাখের বেশি পুলিশ সদস্যসহ পর্যাপ্তসংখ্যক বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য মোতায়েনের তথ্য জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো। পূজা চলাকালে বাহিনীগুলোর প্রধান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারপ্রধান ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় দুর্গাপূজা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এর ফলে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দেয়। তারা অনুভব করেন, সরকার তাদের পাশে রয়েছে।
বাংলাদেশে গত কয়েকটি দুর্গাপূজা ছিল আতঙ্কের, উদ্বেগের। বিশেষ করে গত দুই বছরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এই ধর্মীয় উৎসবে নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এ জন্য এবারের পূজায় যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছিল তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন জেলার পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের উদ্যোগ নেন। শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সফর করেন। সম্প্রীতির বার্তা দিতে পূজার শেষ দিকে, অর্থাৎ নবমীতে দেশের পূজামণ্ডপগুলো ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত মঙ্গলবার দেশের উত্তরাঞ্চলের একাধিক জেলার দুর্গামণ্ডপ ঘুরে দেখেছেন। রংপুরের রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরও পরিদর্শন করেছেন। মণ্ডপে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান এবং ভক্তদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এ সময় উপস্থিত দর্শনার্থী ও ভক্তদের অনুরোধে তিনি হাসিমুখে তাঁদের সঙ্গে সেলফিও তোলেন।
আরও পড়ুন: চার দিন চোখ বাঁধা, পাঁচ দিন পরপর মিলত খাবার
রংপুর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজশাহীর ধর্মসভা মন্দিরের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি পূজারিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানান। রংপুর ও রাজশাহীর দুটি মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী গত মঙ্গলবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে জে এম সেন হলে পৌঁছান। জে এম সেন হলে গত ৪০ বছর ধরে দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর শাখা। পরিষদের নেতারা জানান, এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী জে এম সেন হলে দুর্গাপূজা দেখতে এলেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমনে পূজামণ্ডপে উৎসবের মধ্যেও বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ তৈরি হয়। সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে উলুধ্বনি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে মণ্ডপে স্বাগত জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর যেমন ছিল ঐতিহাসিক, তেমনি এসব এলাকায় পূজা উপলক্ষে তাঁর বক্তব্যও ছিল যুগান্তকারী। বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রূপকল্প তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী মণ্ডপগুলো পরিদর্শন করেন এবং দেশের যুবসমাজসহ সর্বস্তরের জনগণকে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবটিকে একটি সর্বজনীন রূপ দিয়েছে। উৎসব চলাকালে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রাক্-পূজা, পূজা চলাকালীন এবং প্রতিমা বিসর্জন-পরবর্তী—এই তিন স্তরের বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন দেখে মুগ্ধ ভারতীয় হাইকমিশনার। গত সোমবার সকালে রাজধানীর বনানী পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, উৎসবমুখর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বর্ণিল পরিবেশে এবার বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে দুর্গাপূজার উদযাপনে অংশ নিয়ে দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির মিল খুঁজে পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। হাইকমিশনার বলেন, সম্প্রীতি গড়তে হলে সবার মধ্যে সহাবস্থান জরুরি। পূজায় হাইকমিশনার হিসেবে আসিনি, এসেছি পরিবারের সদস্য হিসেবে পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করতে। এ সময় দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা করে অঞ্জলি দেন তিনি। বাংলাদেশে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা উৎসবমুখর পরিবেশেই সম্পন্ন হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন দীনেশ ত্রিবেদী।
এবারের দুর্গাপূজা ছিল অতীতের সব দুর্গাপূজার চেয়ে উৎসবমুখর। দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সারা দেশে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ছয় হাজার এসআরবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া সাড়ে ৫০০ পিকআপ ও সাড়ে ৪০০ মোটরসাইকেল নিয়ে দৃশ্যমান টহল পরিচালনা করা হয়েছিল। দুর্গাপূজায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপ ও স্থানে এসআরবির ডগ স্কোয়াড এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট প্রয়োজনীয় তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করে। যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্পেশাল ফোর্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয়সংখ্যক সদস্য রিজার্ভ রাখা হয়েছিল। এসব সতর্কতার কারণে এবার পূজায় কোনো ধরনের ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি।
প্রতি বছর দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশে একাধিক প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় সংখ্যালঘু হিন্দুদের মনে এবারও আশঙ্কার মেঘ জমেছিল। আদৌ নিরাপদে দুর্গোৎসব পালন করা যাবে কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন সকলে। এই প্রশ্নও উঠছিল, দেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পরও কি মৌলবাদীদের দাপট থাকবে? ফলে শঙ্কা নিয়ে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন হিন্দুরা।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ঘটনা ছাড়াই সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রী ঢাকার বাইরে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের তিনটি আলাদা অঞ্চলে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার বগুড়ার হোটেল মম-ইনের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ার উন্নয়ন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। মীর শাহে আলম বলেন, বিগত নির্বাচনে একটি গোষ্ঠী হিন্দু ধর্মের ভাইদের পকেটের লোক মনে করত। সেখান থেকে তাঁরা বের হয়ে এসে আমাদের প্রতি আস্থা রেখে ভোট দিয়েছেন, আমাদের বিশ্বাস করেছেন। সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন হিসেবে সারা দেশে হাজারো (৩৩,৮৫১টি) পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব পালন হয়েছে। এটা আমাদের জন্য কাঙ্ক্ষিত বিষয়। তাঁরা আমাদের প্রতি আস্থা রেখেছেন, বিশ্বাস রেখেছেন। সেই আস্থা ও বিশ্বাসের মূল্য তারেক রহমানের জনগণের সরকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের দিতে পেরেছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রশাসন এবং বিএনপির লোকজন একসঙ্গে পূজামণ্ডপগুলো পাহারা দিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তাঁদের এ বড় উৎসব সম্পন্ন করতে পেরেছেন। বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজা এলেই নানা ধরনের অশান্তি ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করত একটি গোষ্ঠী। প্রতিবছরই কোনো না কোনো ঘটনা দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে ঘটত। কিন্তু এবার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সব ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসায় ভাসছে বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার পর সবচেয়ে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনের দাবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এবারের পূজা উদযাপনে নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রশাসনের তৎপরতা এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পারস্পরিক সম্প্রীতির বিষয়টি তুলে ধরে অনেকে সরকারের প্রশংসা করছেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন দেশি-বিদেশি অনেক নেটিজেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন মন্তব্যে নেটিজেনরা জানিয়েছেন, এবারের দুর্গাপূজায় তাঁরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদযাপনের সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের মতে, পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতার কারণে উৎসবের পরিবেশ আরও আনন্দমুখর হয়েছে। বিষয়টি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাতেও উঠে এসেছে।





