আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বেওয়ারিশ লাশ

Sadek Ali
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৩:৩৬ অপরাহ্ন, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৪:২৫ অপরাহ্ন, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

# বেওয়ারিশ লাশের পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ 

# জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও হাইকোর্ট মাজারের ফুটপাত থেকে দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার 

আরও পড়ুন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে রাজনীতিমুক্ত, আচরণবিধি তৈরি হচ্ছে শিক্ষকদের

# রাজধানীতে ৮ মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ লাশ: আঞ্জুমান মুফিদুলের তথ্য

# কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ কমবে: তৌহিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক-ঢাবি

আরও পড়ুন: আপাতত নিষিদ্ধই থাকছে আওয়ামী লীগ

প্রাচ্যের নগরী হিসেবে খ্যাত ঢাকায় দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা। নগরের চারপাশ ঘেঁষা নদী, নির্জন স্থান, ডোবাসহ বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যাচ্ছে গলিত বা অর্ধগলিত মরদেহ। যার পরবর্তী ঠিকানা হয় মর্গের হিমঘরে। তবে এসব লাশ কেউ খুঁজতে আসে না। তাদের কোনো স্বজন নেই, নেই দাবিদার। মর্গের ফ্রিজে দিনের পর দিন অপেক্ষার পর একসময় তারা হয়ে যায় ‘বেওয়ারিশ’। রাজধানীতে এমন পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীতে অজ্ঞাতনামা এক কিশোরীর খণ্ডিত মরদেহ এবং জাতীয় ঈদগাহ ও হাইকোর্ট মাজার এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে পুলিশের দাবি, অনেক বেওয়ারিশ লাশ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত হয় না। ফলে মামলা তদন্তে বাড়ে জটিলতা। তবে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ডোম যতন কুমার বলেন, বেওয়ারিশ লাশের ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ফ্রিজিং। ৯টি ফ্রিজ দিয়ে সমস্যা কাটানো যাচ্ছে না। তাই কোনো কোনো বডি ১-১০ রাখা হয়। তবে বিদেশি থাকলে সেক্ষেত্রে সময় বেশি লাগছে। এভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও বেওয়ারিশ লাশ সংরক্ষণ করতে হয়। পরিচয় নিশ্চিত না হলে পুলিশের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হয় বেসরকারি সেবামূলক সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুলের কাছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পেছনে যেমন রয়েছে দুর্ঘটনা ও ভাসমান মানুষের মৃত্যু, তেমনি রয়েছে হত্যাকাণ্ডের শিকার বহু পরিচয়হীন মানুষের নিঃশব্দ পরিণতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারত্বের ঘাটতি, সমন্বিত তথ্যভান্ডারের অভাব, অপরাধপ্রবণ এলাকায় প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, সোর্স নেটওয়ার্কের দুর্বলতা, আধুনিক ডিএনএ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাবে অনেক মরদেহ স্বজনদের কাছে ফিরতে পারছে না।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্যমতে, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতিদিন উদ্ধার হচ্ছে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ। পরিচয় শনাক্ত হলে স্বজনরা মর্গ থেকে মরদেহ নিয়ে যান। কিন্তু পরিচয় না মিললে আইনি প্রক্রিয়া শেষে এসব মরদেহের ঠাঁই হয় ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে। পরে দাফন ও সৎকারের জন্য মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও সৎকার করা হয়েছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে ৫০টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩০, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯, মার্চে ৫২, এপ্রিলে ৪৬, মে মাসে ৫৬, জুনে ৬৭, জুলাইয়ে ৪২ এবং আগস্টে ৪৮টি মরদেহ রয়েছে। এর মধ্যে জুরাইন কবরস্থানে ৭৪টি ও মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে ৩২৫টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। একটি মরদেহ সৎকার করা হয়েছে পোস্তগোলা শ্মশানঘাটে। তবে এ সংখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এত বেশি সংখ্যক মরদেহ বেওয়ারিশ হওয়ার কথা নয়।

বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত জানা নেই। এর আগে ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৫ সালে ৬৪৩টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও সৎকার করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। ডিএমপি সূত্র বলছে, রাজধানীর সড়ক, রেললাইন, ফুটপাত, পার্ক, নদী, খাল ও ঝিলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতিদিন অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের সবাই হত্যার শিকার নন। সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে কিংবা অসুস্থতায়ও অনেকে মারা যান। তাদের বেশির ভাগ ভবঘুরে, মানসিক ভারসাম্যহীন, গৃহহীন কিংবা দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন না থাকায় অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তবে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড বা বিকৃত করে ফেলার ঘটনাও রয়েছে। এতে ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তে হিমশিম খেতে হয় পুলিশকে। সর্বশেষ সোমবারও রাজধানীর শাহবাগ, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী ও কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে এক নারীসহ পাঁচজনের অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে পুলিশ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে চেষ্টা করে। অর্ধগলিত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়। মর্গে জায়গার সংকট থাকায় পরে মরদেহ দাফন করা হয়। সম্প্রতি আদাবরের একটি খাল থেকে ব্যাগ ও বস্তায় ছয় টুকরা অবস্থায় এক তরুণীর অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অর্ধগলিত হওয়ায় তাঁর আঙুলের ছাপও নষ্ট হয়ে গেছে। প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও এখন পর্যন্ত পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফনসেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ বলেন, পুলিশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না। সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ মরদেহ হস্তান্তর করলে তারা দাফন বা সৎকার করে। তবে মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন বলেন, ঢাকায় বেওয়ারিশ মরদেহের বড় একটি অংশ হত্যাকাণ্ডের শিকার। এসব হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন ও বিচার কম হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে। তাঁর মতে, হত্যার পর লাশ গুম করেও যাতে কেউ পার না পায়, সে জন্য রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় জুরাইন কবরস্থান এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ-সংলগ্ন কবরস্থানে বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হচ্ছে। লাশ দাফনের জায়গা নিয়ে একসময় জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এর ফলে অনেক বেওয়ারিশ লাশ দীর্ঘদিন মর্গে পড়ে ছিল। গত ১২ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে তিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রাজধানীর আদাবরের হাক্কারপাড় খালে ভেসে আসা একটি স্কুলব্যাগ থেকে খণ্ডিত অবস্থায় এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও হাইকোর্ট মাজারের কাছে ফুটপাত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁদের একজনের বয়স আনুমানিক ৬৫ এবং অন্যজনের ৪৫ বছর।

আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বলেন, শনিবার বিকেল ৫টার দিকে ওই খাল থেকে একটি স্কুলব্যাগে কিশোরীর মরদেহের চারটি খণ্ড উদ্ধার করা হয়। এর প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর তাঁর দুটি পা উদ্ধার করা হয়। নিহত কিশোরীর বয়স ১৪ থেকে ১৬ বছর। এখনও তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। ওসি বলেন, নিহত কিশোরীর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সার্ভারে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর এনআইডি না থাকায় আঙুলের ছাপের সঙ্গে মেলানোর মতো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। খণ্ডিত মরদেহটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আদাবর থানায় হত্যা মামলা করেছে। অপরদিকে একই দিনে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও হাইকোর্ট মাজারের কাছে ফুটপাত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, পথচারীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাইকোর্ট মাজার ও জাতীয় ঈদগাহের কাছে ফুটপাত থেকে দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজনের পরিচয় জানা গেছে। তাঁর নাম জুয়েল, বাড়ি লালবাগ। অন্যজনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।

পুলিশ জানায়, অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তা স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে মর্গে রাখা হয়। এসব ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় পুলিশ। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন বলেন, বেওয়ারিশ লাশ বেড়েছে, এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। আপনারা যে তথ্য পেয়েছেন, সেটা আপনাদের বিশ্লেষণ। তবে বেড়েছে কি না, সেটি আমাদেরও জানা প্রয়োজন।

কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, একটি দেশে বেওয়ারিশ লাশ তখনই বাড়বে, যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই বলে ধরে নিতে হবে। অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা ও পেশাদারত্বের ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে। তারা বুঝতে পেরেছে, অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। ফলে বেওয়ারিশ লাশ বাড়ছে।

তিনি বলেন, অপরাধীরা হত্যার পর লাশ টুকরো করছে, ব্যাগে ভরে পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। এতে মরদেহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে হত্যা ছাড়াও বিভিন্ন কারণে বেওয়ারিশ লাশ বাড়ছে। এসব নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কোনো দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, প্রথমত, পুলিশের যে ঘাটতি রয়েছে, তা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকার করার মানসিকতা থাকতে হবে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং পুলিশের সোর্স নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে। তাহলে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সহজ হবে। পাশাপাশি তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ কমবে।