তুরস্কের অবাক করা ৫ দর্শনীয় স্থান

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:১৯ অপরাহ্ন, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৪:১৯ অপরাহ্ন, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ঐতিহ্য, ইতিহাস ও বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ তুরস্ক। দেশটির ব্যস্ত শহর ও সমুদ্রতীরের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের বাইরেও ছড়িয়ে আছে এমন কিছু বিস্ময়কর স্থান, যা দেখলে রীতিমতো অবাক হতে হয়। মাটির নিচের প্রাচীন নগরী থেকে শুরু করে পাহাড়ের চূড়ায় বিশাল পাথরের মূর্তি কিংবা হাজার বছর ধরে জ্বলতে থাকা আগুন—তুরস্কে রয়েছে এমন অনেক দর্শনীয় স্থান, যা সাধারণ পর্যটন তালিকায় খুব একটা দেখা যায় না।

তুরস্কে ভূমধ্যসাগরের দারুণ সব সৈকত, বিলাসবহুল রিসোর্ট ও আকর্ষণীয় স্পা রয়েছে। তবে দেশটির বিশাল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত জায়গাগুলোও পর্যটকদের জন্য কম বিস্ময়কর নয়। মাটির নিচে, পাহাড়ের চূড়ায় কিংবা বিশাল পাথরের মাঝে লুকিয়ে আছে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, অসাধারণ প্রাকৃতিক বিস্ময় ও চোখধাঁধানো দৃশ্য।

আরও পড়ুন: মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রথমবার স্বীকার করল যুক্তরাষ্ট্র

কৌতূহলী ভ্রমণপিপাসুদের জন্য তুরস্কের এমনই পাঁচটি অবাক করা গন্তব্য তুলে ধরা হলো।

কাপ্পাদোসিয়ার ভূগর্ভস্থ শহর কায়মাকলি

আরও পড়ুন: দক্ষিণ আফ্রিকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২১

তুরস্কের কাপ্পাদোসিয়ায় গেলে শুধু ওপরের দিকে তাকালেই হবে না, চোখ রাখতে হবে মাটির নিচেও। আগ্নেয় শিলায় গঠিত কাপ্পাদোসিয়ার বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতির নিচে লুকিয়ে আছে প্রাচীন ভূগর্ভস্থ শহর কায়মাকলি।

মাটির প্রায় ৪০ মিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত শতাধিক সুড়ঙ্গ নিয়ে গড়ে উঠেছে এই প্রাচীন শহর। আরব-বাইজেন্টাইন যুদ্ধের সময় খ্রিস্টানদের আশ্রয়স্থল হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারাও এর কিছু অংশ সংরক্ষণাগার হিসেবে ব্যবহার করেন।

ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে ফ্রিজীয়রা গুহাগুলো খোদাই করে এর প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করেছিল। পরে শহরটি ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়। এখানে আস্তাবল, গির্জা, বসবাসের কক্ষ, রান্নাঘর এমনকি ধাতু তৈরির কর্মশালাও ছিল।

কায়মাকলির আটটি তলার মধ্যে পর্যটকদের জন্য চারটি তলা উন্মুক্ত। পুরো শহরটিতে একসময় প্রায় ২০ হাজার মানুষ বসবাস করতে পারত বলে ধারণা করা হয়। আয়তনের দিক থেকে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ শহরগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইয়াজিলিকায়ার প্রাচীন হিট্টাইট শিলাখোদাই মন্দির

তুরস্কে হাজার হাজার প্রাচীন শিলাখোদাই ধর্মীয় স্থাপনা রয়েছে। তবে ইয়াজিলিকায়া দেশটির সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত হিট্টাইট ধর্মীয় স্থান।

খ্রিস্টপূর্ব ১৩ শতকে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি একসময় মন্দির ও দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। বর্তমানে এসব স্থাপনার অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে এবং শুধু ভিত্তির কিছু অংশ টিকে আছে।

তবে এখানকার বিশাল পাথরের দেয়ালগুলোতে এখনো দেখা যায় ৮৩ জন দেবতার খোদাই করা অবয়ব। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন দানব ও সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজাদের চিত্র। পাথরের গায়ে খোদাই করা এসব ভাস্কর্য প্রাচীন হিট্টাইট সভ্যতার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

দুপুরের দিকে ইয়াজিলিকায়া পরিদর্শন করাই সবচেয়ে ভালো। এ সময় সূর্যের অবস্থানের কারণে পাথরে খোদাই করা চিত্রগুলো সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। পর্যটকরা চাইলে কাছেই অবস্থিত প্রাচীন হিট্টাইট রাজধানী হাত্তুসাও ঘুরে দেখতে পারেন। ইয়াজিলিকায়া ও হাত্তুসা—দুটিই ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত।

সালদা হ্রদের চোখধাঁধানো সাদা তীর

সালদা হ্রদে পৌঁছালে অনেকেরই মনে হতে পারে, তারা হয়তো ভুল জায়গায় চলে এসেছেন। তুরস্কের আন্তালিয়ার উত্তর-পশ্চিমে বুরদুর প্রদেশে অবস্থিত এই হ্রদের সাদা তীর আর নীলাভ স্বচ্ছ পানি অনেকটা মালদ্বীপের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ভূ-গাঠনিক পরিবর্তনের ফলে তৈরি এই হ্রদের তীরে রয়েছে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোম্যাগনেসাইটের আস্তরণ। এর কারণেই হ্রদের তীর এত উজ্জ্বল সাদা দেখায়। অন্যদিকে গভীর পানির বিভিন্ন নীল রং পুরো দৃশ্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

কিছু অংশে হ্রদটির গভীরতা প্রায় ২০০ মিটার। ফলে এটি তুরস্কের গভীরতম হ্রদগুলোর একটি।

সালদার সাদা তীর পিকনিক, রোদ পোহানো কিংবা পানিতে নামার জন্য আকর্ষণীয় জায়গা। আবার হ্রদের আশপাশের কালো পাইনবন ঘেরা পাহাড়ে রয়েছে দারুণ সব হাঁটার পথ।

তবে সালদা হ্রদের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় সম্ভবত পানির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন জীবনের প্রমাণ। এখানে পাওয়া প্রাচীন জীবাশ্ম নাসার বিজ্ঞানীদের মঙ্গল গ্রহে ২০২০ সালের অভিযান প্রস্তুতিতেও সহায়তা করেছিল।

মাউন্ট নিমরুদের প্রাচীন বিশাল মূর্তি

মিসর ও মেক্সিকোর পিরামিডের কথা আমরা সবাই জানি। তবে তুরস্কেও রয়েছে মানুষের তৈরি এক অসাধারণ পাহাড়। আনাতোলিয়ার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মাউন্ট নিমরুদের চূড়া খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে কম্মাজেন রাজ্যের শাসক রাজা অ্যান্টিওকাস প্রথম থিওসের সমাধি হিসেবে নির্মাণ করা হয়।

কম্মাজেন ছিল গ্রিক-ফারসি প্রভাবিত একটি রাজ্য, যা পরবর্তী সময়ে রোমানদের অধীনে চলে যায়।

তবে মিসরের পিরামিড কিংবা মেক্সিকোর চিকেন ইৎজার মতো নয়, নিমরুদ পাহাড়ের চূড়াজুড়ে রয়েছে বিশাল সব মূর্তি, স্তম্ভ ও স্মৃতিস্তম্ভ। এগুলো মূলত প্রয়াত রাজাকে স্মরণ করে নির্মাণ করা হয়েছিল।

এখানে রয়েছে তিনটি প্রধান টেরেস বা ধাপ। এর মধ্যে পূর্ব দিকের টেরেসটি সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত। সেখানে দেবতা ও রাজাদের বিশাল মূর্তি রয়েছে। এসব মূর্তির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত। মূর্তিগুলোর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সামনে মাটিতে পড়ে আছে—যা পুরো স্থাপনাটিকে আরও রহস্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

ইয়ানারতাশের জ্বলন্ত পাথর

তুরস্কের আনতালিয়ার প্রায় ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, অলিম্পোসের কাছে রয়েছে ইয়ানারতাশ। প্রায় ৫ হাজার বর্গমিটার পাথুরে এলাকায় ছড়িয়ে থাকা কয়েক ডজন ছোট আগুন এখানকার অন্যতম বিস্ময়।

পাথরের ফাটল ও গর্তের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসের কারণে এসব আগুন জ্বলে ওঠে। বিভিন্ন সময় আগুনের তীব্রতা ও অবস্থানও পরিবর্তিত হয়।

রাতে এই আগুনগুলো দেখতে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় লাগে। অন্ধকারের মধ্যে পাথরের ফাঁকফোকর থেকে বেরিয়ে আসা আগুন পুরো এলাকাকে এক রহস্যময় পরিবেশে পরিণত করে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব আগুন প্রায় ২ হাজার ৫০০ বছর ধরে জ্বলছে বলে ধারণা করা হয়। তাই তুরস্কের এই স্থানটি এমন এক প্রাকৃতিক দৃশ্য, যা পৃথিবীর অন্য অনেক পর্যটনকেন্দ্রের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা।

 সূত্র: ইউরোনিউজ