গোপালগঞ্জে ‘বিএনপি ম্যাজিকে’ বাজিমাত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে গোপালগঞ্জ একটি বিশেষ নাম। স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকে এই জেলা পরিচিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে। সেই গোপালগঞ্জেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একযোগে তিনটি আসনে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), তা নিছক একটি ফল নয়—এটি রাজনৈতিক প্রতীকের পুনর্লিখন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে গোপালগঞ্জের ফলাফলকে স্থানীয়ভাবে বলা হচ্ছে ‘বিএনপি ম্যাজিক’। কিন্তু রাজনীতিতে ম্যাজিক বলে কিছু নেই; আছে হিসাব, কৌশল, সংগঠন ও সময়ের সমীকরণ। প্রশ্ন হচ্ছে—কীভাবে সম্ভব হলো এই পরিবর্তন?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জের তিনটি আসনেই বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থীরা। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ জেলায় একযোগে তিন আসনে বিএনপির জয়কে স্থানীয় রাজনীতিতে ‘বিএনপি ম্যাজিক’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তিনটি আসনের গণভোটেও ‘না’ ভোটের জয় বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও জোরালো করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আরও পড়ুন: চবি ল্যাবরেটরী কলেজের ১১জন শিক্ষক হারালেন চাকরি
গোপালগঞ্জ–১ (মুকসুদপুর ও কাশিয়ানীর অংশবিশেষ) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সেলিমুজ্জামান মোল্যা পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৮৬৭ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গণঅধিকার পরিষদ–এর মো. কাবির মিয়া পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৯৬১ ভোট। ফলে ১৪ হাজার ৯০৬ ভোটের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন সেলিমুজ্জামান। এই আসনে এর আগে মাত্র একবার—১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে—বিএনপির প্রার্থী এফ ই শরফুজ্জামান জাহাঙ্গীর বিজয়ী হয়েছিলেন। প্রায় তিন দশক পর আবারও এই আসনে বিএনপির প্রত্যাবর্তন দলটির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গোপালগঞ্জ–২ আসনে বিএনপি মনোনীত কে এম বাবর পেয়েছেন ৪০ হাজার ৪৮ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এম এইচ খান মঞ্জু, যিনি পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৩৯ ভোট। দলীয় বিভক্তির প্রভাব সত্ত্বেও ৭ হাজার ৯ ভোটের ব্যবধানে জয় পান বাবর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহী প্রার্থী উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও মূল প্রার্থীর পক্ষে সাংগঠনিক শক্তি ও কেন্দ্রভিত্তিক সমন্বয় ভূমিকা রেখেছে।
আরও পড়ুন: সিলেট থেকে কারা হচ্ছেন নতুন সরকারের মন্ত্রী!
গোপালগঞ্জ–৩ আসনে বিএনপি মনোনীত এস এম জিলানী পেয়েছেন ৬০ হাজার ১৬৬ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৮৬৭ ভোট। ফলে ২৬ হাজার ২৯৯ ভোটের বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয়। এই আসনে ভোটের ব্যবধান তুলনামূলক বেশি হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এটিকে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটেও তিনটি আসনেই ‘না’ ভোট প্রাধান্য পেয়েছে। গোপালগঞ্জ–১:
‘হ্যাঁ’ ভোট: ৫৪ হাজার ৭১৬, ‘না’ ভোট: ১ লাখ ২৮ হাজার ২৯৮, গোপালগঞ্জ–২: ‘হ্যাঁ’ ভোট: ৩৪ হাজার ৩০১, ‘না’ ভোট: ১ লাখ ৭ হাজার ২৯০, গোপালগঞ্জ–৩: ‘হ্যাঁ’ ভোট: ৩৩ হাজার ৪৯৮ ‘না’ ভোট: ৯৩ হাজার ৩৬৮। তিনটি আসনেই ‘না’ ভোট দ্বিগুণ বা তারও বেশি ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় এটিকে জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অনেকেই। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংসদ নির্বাচনে যাঁরা ভিন্ন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের বড় অংশ গণভোটে ‘না’ দিয়েছেন। কয়েকটি কেন্দ্রে সংসদ ভোটে ব্যবধান কম হলেও গণভোটে ‘না’ ভোট ছিল দ্বিগুণেরও বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধুই দলীয় ভোট নয়—বরং নির্দিষ্ট প্রশ্নে জনমতের প্রতিফলন।
গোপালগঞ্জ জেলা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ–এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এ জেলার সঙ্গে আওয়ামীলীগ–এর রাজনৈতিক ও পারিবারিক সম্পর্ক জড়িত থাকায় জাতীয় রাজনীতিতে গোপালগঞ্জের গুরুত্ব বরাবরই বেশি। সেই প্রেক্ষাপটে একযোগে তিন আসনে বিএনপির জয় এবং গণভোটে ‘না’ ভোটের সাফল্য স্থানীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
ভোটের দিন সকালে কেন্দ্রগুলোতে উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি বাড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। বিচ্ছিন্ন কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
নির্বাচনে আবেগ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় নির্ধারণ করে সংগঠন। কেন্দ্রভিত্তিক এজেন্ট, ভোটার টার্নআউট ব্যবস্থাপনা, তৃণমূল পর্যায়ের যোগাযোগ—এসব বিষয়েই এগিয়ে থাকলে ফল পক্ষে আসে। বিএনপির এই সাফল্যের পেছনে স্থানীয় পর্যায়ে ঐক্যবদ্ধ সাংগঠনিক প্রস্তুতি বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও প্রভাব ফেলেছে। অনেক সময় ভোট দলকে নয়, ব্যক্তিকেও দেওয়া হয়—বিশেষ করে স্থানীয় নির্বাচনে।
গোপালগঞ্জের মতো প্রতীকী জেলায় ফলাফল পরিবর্তন জাতীয় রাজনীতিতে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। এটি একদিকে বিজয়ী দলের কর্মীদের মনোবল বাড়ায়, অন্যদিকে প্রতিপক্ষকে কৌশল পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করে। এই ফল যদি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ হয়, তবে তা ভবিষ্যতের নির্বাচনী সমীকরণ বদলে দিতে পারে। আর যদি এটি সাময়িক পরিস্থিতির ফল হয়, তবে আগামী নির্বাচনে চিত্র ভিন্নও হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অনুপস্থিতি বা নিষ্ক্রিয়তা, বিরোধী ভোটের একমুখী সমাবেশ, স্থানীয় ইস্যুতে জনঅসন্তোষ,
এবং গণভোটের প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান—এই চারটি বিষয় বিএনপির পক্ষে ফলাফল টেনে আনতে সহায়ক হয়েছে। একজন প্রবীণ ভোটার বলেন, “এবার মানুষ দল নয়, পরিস্থিতি বিবেচনায় ভোট দিয়েছে।” সব মিলিয়ে গোপালগঞ্জের ফলাফল শুধু জেলা নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘বিএনপি ম্যাজিক’—এই শব্দবন্ধে উত্তেজনা আছে, নাটকীয়তা আছে। কিন্তু বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি মূলত রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল। সংগঠন, প্রার্থী, ভোটার মনোভাব ও সময়—এই চার উপাদানের সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে গোপালগঞ্জের নতুন সমীকরণ। রাজনীতিতে স্থায়ী কিছু নেই। আজ যে ঘাঁটি অটুট মনে হয়, কাল সেটিই বদলে যেতে পারে। গোপালগঞ্জের সাম্প্রতিক ফল সেই চিরন্তন সত্যকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।





