সোনারগাঁওয়ের রতনের প্রতারণাসহ নানা গুরুতর অভিযোগ
ভয়ংকর এক প্রতারকের নাম নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানার লেদামোদি গ্রামের আবুল হাসেম রতন। ব্যবসার টাকা আত্মসাৎ, জমি বেচা-বিক্রি, মিথ্যা প্রলোভনে এবং অবৈধভাবে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াই তার কাজ। তবে তার বেশভূষা দেখে চেনার উপায় থাকে না। এ কারণে তার প্রতারণায় সর্বস্বান্ত হয়ে অনেক ভুক্তভোগী থানা, আদালতে মামলাও করেছেন। পতিত সরকারের এই দোসর বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করে এখন বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন।
পুলিশের অপরাধ ডাটাবেজ ঘেঁটে পাওয়া গেছে, ভয়ংকর প্রতারক রতনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর একটি মামলা দায়ের করা হয়। সিআর মামলা নম্বর ১২২/২৪। এই মামলায় প্রাথমিক তদন্তে রতনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় আদালতে ইতোমধ্যেই চার্জশিট বা অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেন। ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানায় রতনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে অপর একটি মামলা হয়। মামলা নম্বর-৭। মামলায় তার বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৩২৩, ৩৩৩, ৩৫৩ এবং ৩০৭ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায়ও রতনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
আরও পড়ুন: লালমনিরহাটে অর্ধেক কাটা হাত নিয়ে মৃত্যুঝুঁকিতে রিকশাচালক, ক্লিনিক ঘেরাও
এছাড়া ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানার মামলায় পেনাল কোডের ৪০৬/৪২০/৫০৬ ধারায় আসামি আবুল হাসেম রতন ও মো. আবুল কাসেম খোকন উভয় পিতা- মো. আব্দুল কাদের। স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম-লেদামদি, থানা-সোনারগাঁ, জেলা নারায়ণগঞ্জকে আসামি করা হয়। মামলা নম্বর-০৬।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ওয়ালটন গ্রুপের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য এক্সক্লুসিভ ডিলার হিসেবে মনোনীত হন প্রতারক রতন। লোক দেখানো স্বর্ণা ইলেকট্রনিক্সের নামে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তীতে তার আপন বড় ভাই খোকনকে ব্যবসা পরিচালনা এবং জামিনদার হিসেবে মনোনীত করেন প্রতারণার অংশ হিসেবে। ব্যবসা শুরুর প্রথম দিকে নগদে ও বাকিতে লেনদেন করে বিশ্বস্ততা অর্জন করেন, যা ছিল তার প্রতারণার কৌশল।
আরও পড়ুন: ব্রিতে নতুন ডিজি যোগদান ঘিরে উত্তেজনা, পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান ও বিক্ষোভ
তিনি আরও বাকিতে পণ্য চাইতে থাকেন এবং আশ্বাস দেন যে, শিগগিরই বাকি থাকা পণ্যের অর্থ পরিশোধ করা হবে। পরবর্তীতে প্রতারণামূলকভাবে কোম্পানির অর্থ ও পণ্য আত্মসাতের উদ্দেশ্যে অধিক পরিমাণে ওয়ালটন পণ্য বাকিতে ক্রয় করে কম পরিমাণ টাকা পরিশোধ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে আসামিদের কাছে পাওনা টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় উল্লেখিত টাকা। পরে ওয়ালটনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আসামিদের লালবাগ এলাকার বর্তমান ঠিকানায় গিয়ে পাওনা টাকা পরিশোধের কথা বললে খোকন টাকা পরিশোধে অস্বীকার করেন এবং হুমকি দেন। আবার টাকা চাইতে গেলে শারীরিক নির্যাতন এমনকি হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, কামরাঙ্গীরচর চৌরাস্তা রনি মার্কেটে ‘স্বর্ণা’ ইলেকট্রনিক্সের স্বত্বাধিকারী ও প্রতারক মো. রতন মিয়ার আবেদনে ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি এক্সক্লুসিভ ডিলার হিসেবে কামরাঙ্গীরচরে মনোনীত করে দেশের সর্ববৃহৎ ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনকারী ও জনপ্রিয় ব্র্যান্ডিং কোম্পানি ওয়ালটন। এরপর থেকে ব্যবসার নামে নানা টালবাহানা ও ছলচাতুরি করে ওয়ালটন ও এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের মোট পাওনা ১৯ কোটি ২৬ লাখ ৪৩ হাজার ৮১৩.০৭ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এখন ব্যবসাতো করেনই না, কোম্পানি যোগাযোগ করেও তার হদিস পাচ্ছে না। বিপুল পরিমাণ আত্মসাৎ করা টাকা দিয়ে তার আপন ভাই ব্যবসা করছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
প্রতারণার বীজ ওয়ালটনের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নেওয়ার শুরু থেকেই বপন করেন রতন। এ কারণে জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম ‘আবুল হাসেম রতন’ থাকলেও স্বর্ণা ইলেকট্রনিক্সের শোরুম নেওয়ার সময় দেওয়া নাম দেন মো. রতন মিয়া। তিন বছর ধরে এখানে শোরুমটিও নেই।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতারক রতনের বড় ভাই আবুল হাসেম সোনারগাঁওয়ে স্থানীয় জাতীয় পার্টির ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এই সুবাদে প্রতারক ও চতুর রতন কোনো পদ-পদবীতে না থাকলেও জাতীয় পার্টির রাজনীতির পাশাপাশি ওই সময় সরকারদলীয় বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্থানীয় রাজনীতির নানা কর্মসূচিতে অর্থের যোগানও দিতেন গোপনে। যে পরিচয়ে সেই সময়ের কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গেও তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। অন্যায় প্রভাবে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানা এলাকায় অনেক মানুষের কাছ থেকে জমি বেচা-বিক্রি বা নানা তদবিরের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ নিয়ে ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করলে প্রতারক রতন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফেলতেন। কামরাঙ্গীরচরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক কোম্পানির শোরুমের মালিকদের কাছ থেকেও এই প্রভাবে অন্যায়ভাবে জোরপূর্বক বিপুল পরিমাণ টাকা চাঁদা আদায় করতেন। এ অন্যায় কাজ জায়েজ করতে রতন স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর ও বহুল আলোচিত মো. হোসেনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এ জন্য কাউন্সিলরকে দামি একটি নোহা গাড়িও উপহার দেন। এলাকায় খোঁজ নিলে যার সত্যতা পাওয়া যাবে। আত্মসাৎ করা বা বিপুল পরিমাণ অবৈধ এই টাকা দিয়ে রতন মিয়া এখন আমেরিকা কিংবা লন্ডনে বিলাসী জীবনযাপন করছেন। বিদেশে রতন টাকা পাচার করতে পারেন, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত করা উচিত।
তদন্তে আরও জানা গেছে, কোম্পানি বা ব্যক্তির টাকা আত্মসাৎ করে ক্ষান্ত থাকে না প্রতারক রতন। একটি প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু করে। মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে প্রোপাগান্ডা চালায়। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ভাড়াটে লোক এনে মানববন্ধনসহ সমাবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানোসহ প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্টের হীন ষড়যন্ত্র করে।
সিআইডি সদর দপ্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য আমরা কাজ করছি।’
ঢাকা ও এর আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে ওয়ালটনসহ বিভিন্ন কোম্পানির ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রি করে আসছেন এমন কয়েকজন ডিস্ট্রিবিউটর বা মালিক এ প্রতিবেদককে জানান, আমরা সততা, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে ব্যবসার মাধ্যমে বৈধভাবে অর্থ উপার্জনের জন্য এসেছি। এ কারণে বিশ্বাস করে কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকার পণ্য দেয় নগদ টাকা ছাড়াই। পণ্য বিক্রি করে নিয়মিত কোম্পানিকে টাকাও পরিশোধ করছি। কোনো প্রতারণা করতে আসিনি। তবে যারা এ কাজ করছে তারা প্রকৃত অর্থে ব্যবসায়ী নয়, তারা প্রতারক।
একাধিক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, দেশের প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য অনেক কোম্পানির মালিক এই জাতীয় প্রতারকদের কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে আছেন। বছরের পর বছর তারা কোম্পানির কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার পণ্য নিয়ে বিক্রি করলেও বিক্রিত টাকা না দিয়ে টালবাহানা করছেন। এমন প্রতারকদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া যাচ্ছে না।
তাহলে কি পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প উদ্যোক্তারা এসব প্রতারক চক্রের কাছ থেকে তাদের পাওনা টাকা উদ্ধার করতে পারবে না?
এমন প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ মো. শামসুল হক বলেন, “শুধু মামলা করলেই হবে না, যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণাদি নিয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে হবে।”





