কালীগঞ্জে সরকারি কলেজে সনদ জালিয়াতি

অধ্যক্ষের সহায়তায় জাল সনদে চাকরি, তুলছেন সরকারি বেতন

Sanchoy Biswas
জাহাঙ্গীর হোসেন, কালীগঞ্জ ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৯:০৪ অপরাহ্ন, ২০ মে ২০২৬ | আপডেট: ৫:৪৫ পূর্বাহ্ন, ২১ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার শমসেরনগর সরকারি ডিগ্রি কলেজে অধ্যক্ষের সহায়তায় জাল সনদ দিয়ে এক শিক্ষকের চাকরি করার প্রমাণ মিলেছে। অভিযুক্ত শিক্ষক দর্শন বিষয়ের প্রভাষক মোছাঃ নাসরিন নাহার বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত আছেন। এছাড়াও তিনি প্রতিমাসে নিয়মিত বেতন তুলছেন। আর এ কাজে কলেজটির অধ্যক্ষ মো. সফিকুল ইসলামের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। বিপুল পরিমাণ টাকার বিনিময়ে তিনি জাল সনদধারীকে কলেজের প্রভাষক পদে চাকরি দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শন বিষয়ে প্রভাষক পদে কালীগঞ্জ উপজেলার পূর্ববর্তী নাম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেমোরিয়াল মহাবিদ্যালয়ে যোগদান করেন। যার বর্তমান নাম শমসেরনগর সরকারি ডিগ্রি কলেজ। কলেজটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে সরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ২০২০ সালের ৫ মার্চ কলেজটি পরিদর্শন করে। মাউশি কর্তৃক পরিদর্শনের পর কলেজটিকে গত ২০২১ সালের ১১ আগস্ট সরকারিকরণের আদেশ জারি করে সরকার। এরপর কলেজ সরকারিকরণ পরবর্তী শিক্ষক-কর্মচারী আত্তীকরণ (পদ সৃজন ও অস্থায়ী নিয়োগ) কার্যক্রম শুরু করার পূর্বেই বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) কর্তৃক শিক্ষকদের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ যাচাইকল্পে ২০২১ সালের ০১ সেপ্টেম্বর এনটিআরসিএ’র নিকট আবেদন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর এনটিআরসিএ তাদের ওয়েবসাইটে সহকারী পরিচালক তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত কলেজের সকল শিক্ষকদের নিবন্ধন সনদ যাচাইয়ের তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে এনটিআরসিএর মন্তব্যের ঘরে উল্লেখ করে দর্শন বিষয়ের প্রভাষক মোছাঃ নাসরিন নাহার-এর সনদটি জাল ও ভূয়া এবং উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কলেজ কর্তৃপক্ষকে থানায় মামলা দায়ের করে অফিসকে অবহিত করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এরপরের দিন থেকে নাসরিন নাহার কলেজে আসা বন্ধ করে দেন।

আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে এনসিপির মহানগর সদস্য সচিবসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা

জালিয়াতি করা শিক্ষকের সনদে দেখা যায়, তিনি ২০০৯ সালের ৫ম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার সনদ দিয়ে প্রভাষক পদে কলেজটিতে যোগদান করেন। যার রোল নম্বর ৪০৭১১৩৯৭। সনদের ফলাফলে তিনি উল্লেখ করেন আবশ্যিক: ০৫৩ ও ঐচ্ছিক: ০৫৫ নম্বর পেয়েছেন। কিন্তু এনটিআরসিএর যাচাইয়ে দেখা যায় তার রোল নম্বরটি অনুত্তীর্ণ। তার প্রাপ্ত নম্বর আবশ্যিক: ০২২, ঐচ্ছিক: ০২৬। সংগত কারণে প্রতীয়মান হয়, সনদটি সঠিক নয়। সনদটি জাল ও ভূয়া।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৪ জানুয়ারি মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) প্রফেসর মোঃ শাহেদুল খবির চৌধুরী স্বাক্ষরিত কর্তৃক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত পদ সৃজন প্রস্তাবেও দেখা যায়, উক্ত শিক্ষকের জাল সনদের বিষয়টি উল্লেখপূর্বক তার নিয়োগ যথাযথ নয় মর্মে তাকে পদ সৃজনে অপ্রস্তাবিত করা হয়। কিন্তু ২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার পদ সৃজনে সুপারিশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদ সৃজন প্রস্তাবনা প্রেরণ করে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই জাল সনদধারী শিক্ষক নাসরিন নাহারের পদ সৃজন করে এবং একই বছরের ১৪ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও এক প্রজ্ঞাপনে জাল সনদধারী নাসরিন নাহারকে প্রভাষক (দর্শন) পদে অস্থায়ী নিয়োগ আদেশ জারি করতে দেখা যায়। আর সেই আদেশের প্রেক্ষিতেই ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাল সনদধারী শিক্ষক নাসরিন নাহার সরকারি ভাবে কলেজে যোগদান করেন এবং সরকারের নিকট হতে জাল সনদধারী হয়েও নিয়মিত সরকারি বেতন ভাতা তুলছেন। আর এ সকল কাজে টাকার বিনিময়ে সহায়তা করেছেন কলেজটির অধ্যক্ষ সফিকুল ইসলাম।

আরও পড়ুন: সোনাগাজীতে খালে পোল্ট্রি বর্জ্য ফেলায় অভিযান, জরিমানা ও ড্রেন সিলগালা

এ বিষয়ে কলেজটির দর্শন বিষয়ের প্রভাষক আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, যে শিক্ষকের নামে এনটিআরসিএ ও মাউশির সুস্পষ্ট সনদ জালিয়াতির রিপোর্ট আছে, মাউশি যাকে পদ সৃজনের সুপারিশই করেনি, এনটিআরসিএ যার বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা করার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ৩ বছরের অধিক সময় যে ব্যক্তি কলেজেই নাই, তার পদ সৃজন ও সরকারি নিয়োগ আদেশ কিভাবে হলো? তিনি যে সরকারি বেতন তুলছেন এটা সরাসরি সরকারি অর্থ আত্মসাতের সামিল। এর দায় অধ্যক্ষ ও যারা ফাইলপত্রের কাজ করেছে তারা এড়াতে পারেন না। এখানে বিপুল অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

জাল সনদধারী শিক্ষক নাসরিন নাহারের মোবাইলে কল দিলে প্রথমে একজন নারী ফোনটি রিসিভ করেন। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর বলেন, আমি একজন গৃহিণী বলে ফোন কেটে দেন। পরে কয়েকবার ফোন দিলে সেটি আর রিসিভ হয়নি।

শমসেরনগর সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সফিকুল ইসলাম বলেন, নাসরিন নাহারের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ জাল কি না তিনি জানেন না। নিবন্ধন সনদ বাদেই নাসরিন নাহারের পদ সৃজন হয়েছে। পদ সৃজন করতে শিক্ষক নিবন্ধনের সনদ দেখানো লাগেনি। আর্থিক লেনদেনের বিষয়টির অভিযোগ তিনি মিথ্যা দাবি করেন। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি মামলা করেননি।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, এ বিষয়ে আপনার কাছেই শুনলাম। খোঁজখবর নিয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।