আইনের শাসনের সংকট: অপরাধ যখন সমাজের প্রতিচ্ছবি
বাংলাদেশের সমাজে আজ এক ভয়াবহ বাস্তবতা দৃশ্যমান- অপরাধ যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিন সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে নির্মমতা, অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারহীনতার নতুন নতুন গল্প। কোথাও দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে চালক, কোথাও একটি শিশুর মৃত্যুর বিচার চেয়ে অসহায় বাবার আর্তনাদ সমাজকে নাড়া দিলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের বিবেক খুব একটা কাঁপছে না।
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এগুলো আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও নৈতিক কাঠামোর গভীর অসুস্থতার প্রতিচ্ছবি।
আরও পড়ুন: কর, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির নতুন ভাষ্য: বাস্তবতা নাকি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস?
একজন ট্রাফিক পুলিশ যখন নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারান, তখন শুধু একজন মানুষের মৃত্যু ঘটে না- মৃত্যু ঘটে আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধেরও। কারণ অপরাধী জানে, কিছুদিন আলোচনা হবে, কিছুদিন প্রতিবাদ হবে, তারপর সবকিছু আবার ধামাচাপা পড়ে যাবে। একইভাবে, সন্তানের মৃত্যুর বিচার না পাওয়ার হতাশায় যখন একজন বাবা বলেন, "আমি বিচার চাই না, কারণ বিচার হবে না" -তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত বেদনার প্রকাশ নয়; এটি পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থার নির্মম স্বীকারোক্তি।
আজ প্রশ্ন উঠছে- অপরাধ এত বাড়ছে কেন?
আরও পড়ুন: সীমান্ত সাংবাদিকতার ব্যবচ্ছেদ: আবেগ বনাম বস্তুনিষ্ঠতা
প্রথমত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহস জোগাচ্ছে। যখন মানুষ দেখে বড় অপরাধ করেও অনেকে পার পেয়ে যায়, তখন আইনের ভয় কমে যায়। আইনের শাসনের জায়গায় যদি প্রভাবশালীদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে ন্যায়বিচারের আশা হারিয়ে ফেলে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ- সব জায়গাতেই মানবিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাচ্ছে। আমরা সন্তানদের ভালো মানুষ হওয়ার চেয়ে "সফল" হওয়ার শিক্ষা বেশি দিচ্ছি। অথচ নৈতিকতা ছাড়া সফলতা একসময় সমাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীয়ত, মাদক, বেকারত্ব ও হতাশা তরুণ সমাজকে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। একটি হতাশাগ্রস্ত যুবসমাজ সহজেই সহিংসতা, অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। কর্মসংস্থানের সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি মানুষের সংবেদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। মানুষ এখন অনেক অপরাধকে বিনোদনের মতো দেখে, প্রতিবাদের জায়গায় "ভাইরাল" হওয়ার প্রতিযোগিতা চলে।
তাহলে সমাধান কোথায়?
সমাধান কেবল কঠোর শাস্তিতে নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও মানবিক সমাজ গঠনে।
প্রথমত, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ বা ক্ষমতার কারণে রক্ষা না পায়। বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলকভাবে জোরদার করতে হবে। শুধু জিপিএ নয়, মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ শেখাতে হবে।
তৃতীয়ত, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। হতাশ যুবসমাজকে আশার পথ দেখাতে না পারলে অপরাধ কমানো কঠিন হবে।
চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও জনবান্ধব হতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জন ছাড়া অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, সমাজকে নীরবতা ভাঙতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে সোচ্চার হতে হবে। কারণ অন্যায়ের সাথে আপস করতে করতে একসময় পুরো সমাজই অন্যায়ের কাছে বন্দি হয়ে পড়ে।
আজ যে ট্রাফিক পুলিশ নিহত হয়েছেন, কাল হয়তো সেই জায়গায় দাঁড়াবে আরেকজন। আজ যে বাবা সন্তানের বিচার না পেয়ে কান্না করছেন, কাল সেই কান্না অন্য কারো ঘরে পৌঁছাবে। যদি আমরা এখনই জেগে না উঠি, তবে অপরাধ একসময় শুধু খবরের শিরোনাম থাকবে না- এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে যাবে।
রাষ্ট্রের শক্তি কেবল উন্নয়ন প্রকল্পে নয়; রাষ্ট্রের আসল শক্তি আইনের শাসনে, ন্যায়বিচারে এবং মানুষের নিরাপত্তায়। আর সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেলে সভ্যতার সব অর্জনই একদিন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এম এফ ইসলাম মিলন, ব্যবসায়ী ও কলামিস্ট





