ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য স্টেশন নির্মাণ, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা; কাজ বন্ধে আদালতের নির্দেশ
গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র (ওয়েস্ট ট্রান্সফার স্টেশন) নির্মাণকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে নির্মাণাধীন এই প্রকল্প পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্ট নির্মাণকাজে স্থগিতাদেশ দিলেও প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শালবন এবং রাজধানী ঢাকার ‘ফুসফুস’ হিসেবে পরিচিত। প্রায় ৫ হাজার ২২ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই সংরক্ষিত বন হরিণ, বুনো শূকর, বেজি, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের নিরাপদ আবাসস্থল।
আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে দেশীয় অস্ত্রসহ ৪ ডাকাত গ্রেপ্তার
এমন একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে গাজীপুর সিটি করপোরেশন একটি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র (Secondary Transfer Station - STS) নির্মাণ করছে। প্রকল্পটি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও পরিবেশবিদ ও বন কর্মকর্তারা এর বিরোধিতা করছেন।
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, গত বছরের মার্চ মাসে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের একটি ডাম্প ট্রাক ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য ফেলতে গিয়ে ধরা পড়ে। সে সময় ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরে আবার একই ধরনের কার্যক্রম চালানো হয়।
আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে ভেজাল ঘি কারখানায় অভিযান: ৩ লাখ টাকা জরিমানা
চলতি বছরের ১১ এপ্রিল গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা উদ্যানের সীমানাপ্রাচীরের পাশে নির্মাণকাজ শুরু করেন। বন বিভাগের কর্মকর্তারা অনুমোদনের কাগজপত্র চাইলে তারা তা দেখাতে পারেননি।
পরদিন রাতে এক্সকাভেটর দিয়ে জাতীয় উদ্যানের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে নির্মাণসামগ্রী প্রবেশের পথ তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বন বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ বন্ধ করতে গেলে ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক লোকজন জড়ো হওয়ায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বন বিভাগের দাবি, প্রকল্পটির জন্য বন বিভাগ কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অবস্থানগত বা পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।
এ কারণে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী ১৬ ও ২০ এপ্রিল পৃথক চিঠির মাধ্যমে জেলা প্রশাসন, প্রধান বন সংরক্ষক, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেন।
চিঠিতে ১৯২৭ সালের বন আইন এবং ২০২৬ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এ ধরনের কার্যক্রমকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) হাইকোর্টে রিট আবেদন করে।
রিটের শুনানি শেষে ৪ মে হাইকোর্ট ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরের তিনটি নির্দিষ্ট প্লটে সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ছয় মাসের জন্য উদ্যানের আশপাশে বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়।
আদালতের আদেশে গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে শেড, রাস্তা, গভীর নলকূপসহ সব ধরনের নির্মাণকাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জমিটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হলেও জাতীয় উদ্যানের সীমানার ভেতরে হওয়ায় এর ব্যবহারের ওপর আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে।
তার ভাষায়, বর্তমান আইন এমন প্রকল্প ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট। একটি সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
অন্যদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন বলছে, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্তমানে বড় সংকটে রয়েছে।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা খানম বলেন, শহরের ময়লা কোথায় নেওয়া হবে সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন স্থানে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যাচ্ছে না।
তার দাবি, পর্যাপ্ত জমির অভাবের কারণেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
ভাওয়ালের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জাতীয় উদ্যানের ভেতরে শিল্পবর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, গৃহস্থালি ময়লা, পোল্ট্রি বর্জ্য, সিরিঞ্জ, কাচ ও প্লাস্টিক জমা হলে তা পরিবেশ ও বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করবে।
তার মতে, বন্যপ্রাণীরা এসব বর্জ্য ও খাদ্যাবশেষ খেয়ে রোগাক্রান্ত হতে পারে, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটতে পারে। এতে ভাওয়ালের জীববৈচিত্র্য এবং পুরো বাস্তুতন্ত্র স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়বে।
তিনি আরও জানান, প্রকল্পে গভীর নলকূপ স্থাপন করলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যেতে পারে, যা শালবনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে।
ঘটনাস্থলে কর্মরত শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের এবং ২৫ ফুট উচ্চতার এই বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এটি চালু হলে একসঙ্গে প্রায় ২ হাজার টন বর্জ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, প্রকল্পটি চালু হলে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য, বনভূমি এবং পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।





