দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা সদর নিয়ে নতুন উত্তেজনা

Sadek Ali
গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২:৫০ অপরাহ্ন, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১:৩৯ অপরাহ্ন, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নবগঠিত দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার সদর দপ্তর কোথায় স্থাপিত হবে—এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। উপজেলা সদর পাগলা থানা সংলগ্ন ১৬৩ নম্বর পাগলা মৌজায় স্থাপনের দাবিতে ঢাকায় মানববন্ধনে অংশ নিতে যাওয়ার পথে বিএনপির নেতাকর্মী ও আন্দোলনকারীদের বহনকারী গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ উঠেছে। 

একই দিনে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে আন্দোলনকারীরা উপজেলা সদর পাগলায় স্থানান্তর, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেফতারকৃতদের মুক্তির দাবি জানান।

আরও পড়ুন: ধানমন্ডিতে ৩৮ লাখ টাকা ডাকাতি: আগ্নেয়াস্ত্র ও লুণ্ঠিত টাকাসহ ৮ ডাকাত গ্রেফতার

শনিবার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে দক্ষিণ গফরগাঁও এলাকার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে কয়েকশ মানুষ ও বিএনপির নেতাকর্মী ১৫ থেকে ২০টি হাইয়েস মাইক্রোবাসে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গাড়িবহরটি গয়েশপুর এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পক্ষের সমর্থকেরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারীদের দাবি, হামলাকারীরা কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে এবং যাত্রীদের মারধর করে। এ সময় কয়েকজনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন: গোপালগঞ্জে বাস খাদে পড়ে নিহত ৩, আহত ২০

ঘটনার পরও আন্দোলনকারীরা ঢাকায় পৌঁছে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পূর্বঘোষিত মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। সেখানে বক্তারা দাবি করেন, দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের প্রশাসনিক ভোগান্তি কমানো এবং সরকারি সেবা সহজলভ্য করা। কিন্তু উপজেলা সদর নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্য উপেক্ষা করা হয়েছে।

কী নিয়ে বিরোধ?

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার সদর দপ্তর উস্থি ইউনিয়নের ১৪৩ নম্বর নয়াবাড়ী মৌজায় নির্ধারণ করা হয়েছে। গত জুলাই মাসে প্রকাশিত গেজেটেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

তবে পাগলাকেন্দ্রিক আন্দোলনকারীদের দাবি, নয়াবাড়ী ভৌগোলিকভাবে নতুন উপজেলার প্রান্তিক এলাকায় অবস্থিত। ফলে আটটি ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষের জন্য সেখানে যাতায়াত করা কষ্টসাধ্য হবে। অন্যদিকে পাগলা মৌজা দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এটি প্রশাসনিক সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য অধিকতর উপযোগী। এ দাবিতে গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে।

মানববন্ধনে যা বললেন বক্তারা

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে মশাখালী, পাঁচবাগ, উস্থি, লংগাইর, পাইথল, দত্তের বাজার, নিগুয়ারী ও টাঙ্গাব ইউনিয়ন নিয়ে দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সদর দপ্তরের অবস্থান নির্ধারণে জনমত ও ভৌগোলিক বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

বক্তাদের ভাষ্য, পাগলা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে থানা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও তুলনামূলক উন্নত। ফলে এখানে উপজেলা সদর স্থাপন করা হলে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্রুত প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে এবং সরকারের ব্যয়ও কমবে।

তারা আরও অভিযোগ করেন, পাগলায় সদর দপ্তরের দাবিতে আন্দোলন করায় বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং কিছু আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেফতার ব্যক্তিদের মুক্তি না দিলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

আন্দোলনের পেছনের যুক্তি

আন্দোলনকারীরা বলছেন, নতুন উপজেলা ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি স্থানে প্রশাসনিক সদর গড়ে উঠবে, যেখানে আটটি ইউনিয়নের মানুষ সমানভাবে সুবিধা পাবেন। তাদের মতে, পাগলা বাজার ও থানা এলাকা বহু বছর ধরে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ফলে নতুন উপজেলা সদরও সেখানে হওয়া উচিত।

অন্যদিকে সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের মতে, সদর দপ্তর নির্ধারণে প্রশাসনিক ও কারিগরি বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এলাকায় বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ

উপজেলা সদর নিয়ে মতপার্থক্য ক্রমেই রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা। সাম্প্রতিক মানববন্ধন, বিক্ষোভ, মামলা এবং হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ গফরগাঁও এলাকায় উত্তেজনা বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বিষয়টির দ্রুত সমাধান না হলে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হতে পারে।

প্রশাসনের অবস্থান

হামলার অভিযোগ এবং উপজেলা সদর স্থানান্তরের দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তারা বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখবেন।

দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার সদর দপ্তর শেষ পর্যন্ত কোথায় স্থাপিত হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। তবে এ ইস্যু যে স্থানীয় জনগণের আবেগ, স্বার্থ এবং রাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেটি আরও স্পষ্ট হয়েছে।