নেত্রকোনায় গুলিতে নিহত সাংবাদিক আলিফ ছিলেন নিরাপত্তাঝুঁকিতে
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে একটি চায়ের দোকান থেকে বাড়ি ফেরার পথে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এক সাংবাদিককে।
পুলিশ বলছে, দুই ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করে কাছ থেকে গুলি করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
আরও পড়ুন: সুনামগঞ্জের ৪২ মণ্ডপে ৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
নিহত ব্যক্তির নাম লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। তিনি 'ডিটেকটিভ আর্টিকেল' নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন এবং সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখি করতেন।
এছাড়া, বেসরকারি একটি আইপিটিভি (ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিভিশন) চ্যানেলে নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবেও তিনি কর্মরত ছিলেন।
আরও পড়ুন: সাংবাদিক আলিফকে সামনে থেকে গুলি, ৬টি গুলির ৫টিই ভেদ করে যায়
এর আগেও তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল এবং লেখালেখির কারণে তিনি নিরাপত্তার ঝুঁকিতে ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তিনি নিজেও একাধিকবার ওই ব্যক্তিকে সতর্ক করেছিলেন।
তবে কী কারণে এবং কারা তাকে হত্যা করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি পুলিশ।
এর আগেও কারা তাকে হুমকি দিয়েছে বা হামলা করেছে সেব্যপারেও সুনির্দিষ্ট করে পরিবার বা পুলিশ কিছু বলছে না।
'মোবাইলটা চেক করলে বোঝা যাইবো'
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তির বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সুনই গ্রামে। তবে তিনি দুর্গাপুরে তেলনজিয়া গ্রামে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাড়িতে বসবাস করতেন। সেখানে তার দুই সন্তান রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা রাতে শ্বশুরবাড়ি থেকে কয়েক গজ দূরে একটি চায়ের দোকানে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর রাত সোয়া ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান।
পরে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, ওই দোকানে চা পান করার পর ছয়টি সিগারেট কিনেছিলেন লুৎফুজ্জামান আলিফ। সেসময় আরও দুই অপরিচিত ব্যক্তি ওখান থেকে সিগারেট কেনেন।
পরে লুৎফুজ্জামান আলিফ মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গ্রামীণ পথ ধরে শ্বশুরবাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলে ওই দুই ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করে। একপর্যায়ে তারা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তির মাথা, গলা ও বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত পাঁচটি গুলি করা হয়েছে।
গতকাল রাতেই পুলিশ ও কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যান প্রথম আলোর স্থানীয় সাংবাদিক পল্লব চক্রবর্তী। তিনি বিবিসি বাংলাকে দোকানদার রবিন রাংছার বরাত দিয়ে বলেন, "ফকির ওখানেই বসে। গতকাল দোকান থেকে বের হয়ে ১০ ফুটের মতো হেঁটে গেছে। তখনই গুলি করলো।"
তার ভাষায়, দোকানদার পরপর কয়েকটি গুলির শব্দ শুনে ভয় পেয়ে দোকানের ভেতরে আশ্রয় নেন।
ঘটনাস্থলটি দুর্গাপুর থানা থেকে সর্বোচ্চ এক কিলোমিটার দূরে বলে জানান তিনি।
লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল কি না জানতে তার স্ত্রী আনন্দিতা সংমাকে কল দেওয়া হলে কলটি ধরেন মিজ আনন্দিতার মা শিলা সংমা।
তিনি তখন গুলির খবর শোনার মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, "বাসার সামনেই দোকান। তখন একজন লোক এসে বললো, তোমার জামাইর এই অবস্থা। গিয়ে দেখি, একা লাশ পড়ে আছে। আর কোনো মানুষ নাই।"
"ছয়টা গুলি করছে। মাথায়, গলায়, পেটে। এর বিচার যেন আমি পাই। এই দুইটা বাচ্চা নিয়া আমি এখন কী করবো," কান্না করতে করতে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
এরপর তিনি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে বলেন, "মোবাইলটা চেক করলে বোঝা যাইবো যে ও কার সঙ্গে কথা বলছিলো, কার সাথে তর্ক-বিতর্ক হইছিলো। ওর মোবাইল তো এখন পুলিশের হাতে।"
তার দাবি, কোনো একটি সংবাদ প্রকাশের পর নিহত ব্যক্তিকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে কারা সেই হুমকি দিয়েছিল, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।
আগেও হামলা, সতর্ক করেছিল পুলিশ
দুর্গাপুর থানার ওসি জানিয়েছেন, গত বছরের নভেম্বরেও লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
দৈনিক প্রথম আলোর খবরে ওই সময় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের সূত্র দিয়ে লেখা হয়েছিল, ১০ই নভেম্বর বেলা একটার দিকে লুৎফুজ্জামান ও তার সহকর্মী শাহজাহান শেখ দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদী পার হতে একটি ভাড়া মোটরসাইকেলে করে নদীর তেরিবাজার ঘাটে নেমেছিলেন।
"এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে করে চারজন ব্যক্তি সেখানে আসেন। তাদের মধ্যে দু'জন চাপাতি হাতে নিয়ে লুৎফুজ্জামানকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। এতে তার দুই হাত, পিঠ ও শরীরে বিভিন্ন স্থানে জখম হয়।"
ওই ঘটনার বিষয়ে ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, চেহারার মিল থাকার কারণে লুৎফুজ্জামানকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে গিয়ে পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বলে তারা ধারণা করেন।
দেড়-দুই বছর আগে ওই ঘটনা ঘটে জানিয়ে তিনি বলেন, "ওইসময় উনাকে মনে করে একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে কুপায়ে মাইরা ফেলে, তার চেহারার সাথে সিমিলার ছিল বলে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে আমরা ধারণা করি এ কারণেই মারছে। উনি (লুৎফুজ্জামান) নিজেও এটা সবাইকে বলতো"।
ওসি জানান, সেই ঘটনার অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
পুলিশ হত্যা প্রসঙ্গে পল্লব চক্রবর্তীও বলেন, "ফকিরের মাথায় চুল ছিল না, নিহত ওই পুলিশের মাথায়ও চুল ছিল না; চেহারাও তার মতো ছিল। এটা সবসময়ই ফকির সাংবাদিকদের বলতো।"
তবে আগের হামলার সঙ্গে এবারের হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, নিহত ব্যক্তির লেখালেখিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে বিরোধ ছিল। সে কারণে তিনি নিজেও তাকে একাধিকবার সতর্ক করেছিলেন।
"অফিসার ইনচার্জ হিসেবে বারবার সাবধান করছি যে, আপনি দুর্গাপুরে যখনই আসবেন, আমাকে একটু জানাবেন," বলেন তিনি।
ঘটনার দুই দিন আগেও ওই ব্যক্তি থানায় এসেছিলেন বলে জানান ওসি।
"আমি চা-টা খাওয়াইছি। আমি বললাম, যে লেখা লেখেন, আপনার শত্রু তো অনেক বেশি। আমাকে একটু জানাইয়েন আপনি কোথায় অবস্থান করতেছেন। এই এলাকায় আসলেই আমাকে জানায়েন।"
ওসি বলেন, নিহত ব্যক্তি নিরাপত্তার ঝুঁকিতে ছিলেন।
তবে কারও বিরুদ্ধে হত্যার হুমকির অভিযোগে সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন কি না, এমন প্রশ্নে তিনি জানান, 'রিভার্স নিউজ' নামে একটি ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে আগে জিডি করেছিলেন ওই ব্যক্তি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই পেজের সঙ্গে তার লেখালেখিকে কেন্দ্র করে বিরোধ ছিল।
পেজটা কার বা কাদের? জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমরা জানি কে চালায়, কিন্তু উনি স্বীকার করে না।"
কী ধরনের লেখালেখি করতেন লুৎফুজ্জামান?
নিহত ব্যক্তি 'ডিটেকটিভ আর্টিকেল' নামে একটি ফেসবুক পেজে নিয়মিত লেখালেখি করতেন।
দুর্গাপুর থানার ওসি বলেন, তিনি কোনো সাংবাদিক সমিতির সদস্য ছিলেন না বা প্রচলিত গণমাধ্যমেও যুক্ত ছিলেন না। তবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলাভাবে লিখতেন।
"উনি ভুঁইফোড় না। উনি সাহসী ছিলেন। উনি যা লিখতেন, অন্যরা তা লেখার সাহস করতো না," বলেন খন্দকার শাকের আহমেদ।
স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকও লুৎফুজ্জামান আলিফকে 'সাহসী' বলে অভিহিত করেছেন।
জানা যায়, তিনি একসময় সামরিক বাহিনীতে সৈনিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে তিনি অবসরে গিয়েছিলেন, নাকি চাকরি ছেড়ে এসেছিলেন বা চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত জানা যায়নি।
স্থানীয় সাংবাদিক পল্লব চক্রবর্তী জানান, লুৎফুজ্জামান আলিফের বাড়ি তার পাশের গ্রামেই এবং প্রায় তিন থেকে চার বছর ধরে তিনি তাকে চিনতেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তি বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও চোরাচালান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি করতেন। তবে তার প্রকাশিত সব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
"ও সবার বিরুদ্ধে লাগতো। তার কাল ছিল ডিটেকটিভ আর্টিকেল, এটা চার বছর হলো খুলেছে। ওখানে সে অনবরত আংশিক কথা লিখতো। কোথায় দুর্নীতি হচ্ছে, কোথায় স্মাগলিং হচ্ছে, এসব। আবার তার বিরুদ্ধেও অনেকে লিখতো। সবার সাথে সুসম্পর্ক ছিল, এমন না," যোগ করেন পল্লব।
নিহত লুৎফুজ্জামানের 'ডিটেকটিভ আর্টিকেল' পেজে ঘুরে দেখা যায়, তার সর্বশেষ পোস্টগুলোর একটি হল, "আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য প্রমাণ...।"
তবে সেই পোস্টের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, লেখালেখিকে কেন্দ্র করে শত্রুতা কিংবা আগের হামলার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সবকিছুই তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে বলে জানান ওসি শাকের।
নিহত ব্যক্তির পরিবার জানিয়েছে, মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন হলে তারা মামলা করবেন।
দুর্গাপুর থানা পুলিশও জানিয়েছে যে নিহতের স্ত্রীকে বাদী করে হত্যা মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে।





