ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: ভোটের উৎসব, শান্তির পরীক্ষা
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনটি ছিল ভোটারদের জন্য একটি প্রকৃত উৎসব। সকাল থেকে দেশের শহর-গ্রাম সব জায়গায় ভোট কেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘ লাইন। মানুষ চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে ছিল, প্রত্যেকে জানে-এটি কেবল ভোট নয়, গণতন্ত্রের পরীক্ষা। নির্বাচনের এই দৃশ্য প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষ এখনও ভোটকে তাদের অধিকার ও দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে।
ভোটের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। যুবক, বৃদ্ধ, নারী- সব বয়সের মানুষ ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত। রাজনৈতিক দলগুলোও সক্রিয়, সমর্থকরা উৎসাহিত। তবে উৎসবের মধ্যেও স্পষ্ট যে কেউ কাউকে ভয় দেখাতে পারবে না। এই স্বাধীনতা ভোটের শৃঙ্খলা বজায় রাখার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
আরও পড়ুন: নির্বাচনের ছায়ায় রক্তাক্ত রাজনীতি: সহিংসতার অদম্য প্রবণতা
নির্বাচনী দিন শান্তিপূর্ণ ছিল। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসার-মাধ্যমিক আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সক্রিয় ছিলেন। কোন বড় ধরনের সংঘাত বা হাঙ্গামার খবর নেই। ভোটাররা নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এই সুশৃঙ্খল পরিবেশ প্রমাণ করে যে দেশের আইনশৃঙ্খলাবাহিনী শুধুমাত্র উপস্থিতি দেখানোর জন্য নয়, বাস্তব দায়িত্ব পালনের জন্যও প্রস্তুত।
তবুও সব কিছু নিখুঁত ছিল না। কিছু কেন্দ্রে প্রার্থীদের সমর্থক এবং স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষকদের মধ্যে উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেছে। সামান্য ঠেলাঠেলি, শোরগোল- কিছুটা স্বাভাবিক। কিন্তু তা বড়রকমের সংঘাতে রূপ নেয়নি। নির্বাচনী কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনী দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এই হালকা সমস্যা মনে করিয়ে দেয়- গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ শুধু ভোট দেওয়া নয়, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্বের মধ্যেও প্রকাশ পায়।
আরও পড়ুন: খালেদা জিয়া: দেশ এবং জনগণের নেত্রী
ভোটারদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। শহর-গ্রাম সর্বত্র ভোটের হার ইতিবাচক। বিশেষ করে যুব সমাজের উপস্থিতি এবং মহিলাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নির্বাচনকে শক্তিশালী করেছে। এটি দেখায়- দেশের মানুষ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সচেতন ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নির্বাচনের দিন রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডও চোখে পড়েছে। প্রচারণার মধ্যেই কখনো উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তবে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ছোটখাটো সমস্যা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। এটি প্রমাণ করে যে ভোটের উৎসবের সঙ্গে দায়িত্ববোধও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বড় সুবিধা হলো আধুনিক প্রক্রিয়ার ব্যবহার। ভোট কেন্দ্রগুলোতে ইলেকট্রনিক যাচাই, কিউ আর কোড, আধুনিক লগিং- সবই ভোটের স্বচ্ছতা বাড়িয়েছে। ভোটাররা দ্রুত ও সহজে ভোট দিতে পেরেছেন, প্রক্রিয়া শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়েছে। প্রযুক্তি ভোটারদের অভিজ্ঞতা উন্নত করেছে এবং নির্বাচনকে আরও নিরপেক্ষ করেছে।
তবে শিখবার কিছু জায়গা এখনও আছে। হালকা উত্তেজনা, সামান্য ত্রুটি- এগুলো ভবিষ্যতের জন্য নজরে রাখা জরুরি। নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনী যেন আরও দক্ষ, আরও প্রিপেয়ারড থাকে। শৃঙ্খলাবদ্ধ নির্বাচন গ্যারান্টি দেয় না, বরং সক্রিয় পরিকল্পনা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন প্রমাণ করেছে- ভোট উৎসব হতে পারে, অংশগ্রহণ বাড়তে পারে, কিন্তু শৃঙ্খলা বজায় রাখা সবসময়ই মূল চ্যালেঞ্জ। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, ভোটার এবং রাজনৈতিক দল মিলেই এই পরীক্ষা পাশ করেছে। কোনও বড় সংঘাত হয়নি, ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিয়েছেন। এটাই দেশের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় জয়।
নির্বাচনের দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে-ভোট কেবল একটি প্রক্রিয়া নয়। এটি দায়িত্ব, শৃঙ্খলা, সতর্কতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মিলিত পরীক্ষার নাম। উৎসবমুখর পরিবেশে শান্তি বজায় রাখা হলো দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বড় অর্জন।
ভবিষ্যতের জন্যও এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের দিনে ভোটারদের অংশগ্রহণ, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সক্রিয়তা এবং প্রার্থীদের স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের গণতন্ত্রকে শুধু দিনের জন্য নয়, সবসময় সচল রাখতে হবে।
শেষ কথা- ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন দেখিয়েছে, ভোট উৎসব হতে পারে, শান্তি বজায় রাখা সম্ভব, কিন্তু এর জন্য সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং দায়িত্বশীল মনোভাব অপরিহার্য। গণতন্ত্র শুধু অধিকার নয়, শৃঙ্খলাবদ্ধ দায়িত্বের নাম। এই দিনে বাংলাদেশ তা প্রমাণ করেছে।
লেখক: কলামিস্ট ও গণমাধ্যমকর্মী।





