চরমোনাই পীরের তিন ভাইয়ের পরাজয়, এক আসনে হাতপাখার জয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজে প্রার্থী না হলেও নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় ছিলেন চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগে অংশ নেন তিনি। গণমাধ্যমেও ছিল তার নিয়মিত উপস্থিতি।
চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবারের নির্বাচনে সারা দেশে ২৫৩ জন প্রার্থী দেয়। জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে আয়োজিত এই নির্বাচনে রাজনৈতিক মানচিত্রে পরিবর্তনের আশা করেছিলেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
আরও পড়ুন: ঢাকা-১৬ আসনের ফলাফল স্থগিত ও পুনঃনির্বাচনের দাবি আমিনুল হকের
২৫৩টি আসনের মধ্যে বরগুনা-১ আসনে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী অলি উল্লাহ জয় পেয়েছেন। সংসদীয় রাজনীতিতে ইসলামী আন্দোলনের জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
তবে দলের এই একক জয় চরমোনাই পরিবারের নির্বাচনী বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পীরের তিন ভাই চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কেউ বিজয়ী হননি। একজনের ক্ষেত্রে জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
আরও পড়ুন: আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতি সচল করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ: ফখরুল
পরিবারকেন্দ্রিক প্রভাব
ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামোতে চরমোনাই পরিবারের প্রভাব দীর্ঘদিনের। ধর্মীয় নেতৃত্ব ও স্থানীয় সরকারে তাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান।
চরমোনাই পীর ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে চরমোনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। পরবর্তীতে তার ভাই সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বর্তমানে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন আরেক ভাই সৈয়দ মুহাম্মদ জিয়াউল করিম।
পরিবারের চার ভাই—সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের, সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম, সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী এবং সৈয়দ মুহাম্মদ নুরুল করিম—বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে সংসদে পৌঁছানো হয়নি কারও।
কে কোথায় হেরেছেন
বরিশাল-৪
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-কাজিরহাট) আসনে ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫৩ ভোট। একই আসনে বিএনপির প্রার্থী রাজীব আহসান পেয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট এবং জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৬৮৪ ভোট। এখানে তিনি তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন।
ফলাফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবুল খায়ের লেখেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল না এলেও তাদের প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি।
বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬
বরিশাল-৫ (বরিশাল সিটি-সদর) ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে প্রার্থী ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম।
বরিশাল-৫ আসনে তিনি পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫২৮ ভোট। বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৩১ ভোট।
বরিশাল-৬ আসনে ফয়জুল করিম পেয়েছেন ২৮ হাজার ৮২৩ ভোট। বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খান পেয়েছেন ৮১ হাজার ৮৭ ভোট এবং জামায়াতের প্রার্থী মো. মাহমুদুন্নবী পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৫৩৩ ভোট।
ঢাকা-৪
ঢাকা-৪ আসনে প্রার্থী ছিলেন মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী। তিনি ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চরমোনাই আহছানাবাদ রশীদিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন জয়ী হন। হাতপাখা প্রতীকে মোসাদ্দেক বিল্লাহ পেয়েছেন ৬ হাজার ৫১৮ ভোট। প্রয়োজনীয় ভোট না পাওয়ায় তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
চরমোনাই পরিবার ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী বলয় হিসেবে বিবেচিত। ধর্মীয় কার্যক্রম ও সংগঠনভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে।
তবে সংসদীয় নির্বাচনে বৃহত্তর ভোটব্যাংক ও বিস্তৃত রাজনৈতিক জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী আন্দোলনের ভোটব্যাংক এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে। পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াতের শক্ত প্রতিযোগিতার মধ্যে হাতপাখা প্রতীক অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। তরুণ ও শহুরে ভোটারদের মধ্যে দলটির প্রভাবও তুলনামূলক কম বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।





