নির্বাচনের ছায়ায় রক্তাক্ত রাজনীতি: সহিংসতার অদম্য প্রবণতা

Sanchoy Biswas
আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: ৭:৪৫ অপরাহ্ন, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১০:১৯ অপরাহ্ন, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
আহমেদ শাহেদ। ছবিঃ সংগৃহীত
আহমেদ শাহেদ। ছবিঃ সংগৃহীত

নির্বাচন এলেই বাংলাদেশে রাজনীতির রঙ বদলায়। পোস্টার, মাইক, স্লোগানের ভিড়ের আড়ালে আরেকটি চেনা দৃশ্য ফিরে আসে- সহিংসতা, আতঙ্ক আর মৃত্যুর খবর। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন সেই চেনা বাস্তবতাকেই নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। তপশিল ঘোষণার পর মাত্র ৩৬ দিনে ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মীর নিহত হওয়ার তথ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের অসুখের লক্ষণ।

এই সংখ্যাগুলোকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে বড় ভুল হবে। কারণ প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি ভাঙা জীবন, এবং রাষ্ট্রের অপূর্ণ দায়িত্ব। গত ১৭ মাসে ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত ও ৭ হাজারের বেশি আহত হওয়ার তথ্য প্রমাণ করে, রাজনৈতিক সহিংসতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন: খালেদা জিয়া: দেশ এবং জনগণের নেত্রী

তপশিল ঘোষণার পর সহিংসতা বাড়বে- এটি বাংলাদেশে প্রায় অলিখিত সত্য। কিন্তু সত্য হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো যেন এটিকে অবধারিত ধরে নিয়েই প্রস্তুতি নেয়। সহিংসতা ঠেকানোর বদলে ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়াই হয়ে ওঠে প্রধান কাজ।

টিআইবির প্রতিবেদনে দলভিত্তিক সম্পৃক্ততার যে চিত্র উঠে এসেছে, সেটি স্পষ্ট করে বলে দেয় সমস্যাটি একপাক্ষিক নয়। বিএনপি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী- সব পক্ষের নামই এসেছে সহিংসতার তালিকায়। অর্থাৎ রাজনৈতিক সহনশীলতার সংকটটি সর্বব্যাপী। ক্ষমতায় থাকা বা বাইরে থাকা- কোনো অবস্থানই সহিংসতা থেকে মুক্ত নয়।

আরও পড়ুন: সর্বজনীন রেশনিং পুন:প্রবর্তন জনগণের দাবি

এই বাস্তবতার মূল কারণ রাজনৈতিক আস্থাহীনতা। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ থাকবে কি না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পক্ষপাতমুক্ত থাকবে কি না, প্রশাসন রাজনৈতিক চাপ সামলাতে পারবে কি না- এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার উত্তর নেই। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো বিশ্বাস করে, শক্তি দেখানো ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব নয়। সহিংসতা তখন রাজনৈতিক কৌশলে রূপ নেয়।

২০২৫ সালে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০২ জন নিহত হওয়ার তথ্য আরও ভয়ংকর একটি বার্তা দেয়। এটি বোঝায়, সহিংসতা কোনো সাময়িক উত্তেজনার ফল নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রবণতা। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, সহিংসতার গ্রাফ তত ঊর্ধ্বমুখী হয়। কিন্তু এই প্রবণতা ভাঙার মতো দৃঢ় উদ্যোগ কোথায়?

প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো ১ হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র নিখোঁজ হওয়ার তথ্য। একটি দেশে নির্বাচনকালীন সময়ে যদি এত অস্ত্রের কোনো হদিস না থাকে, তাহলে নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বাস কাগুজে কথায় পরিণত হয়। এসব অস্ত্র কার হাতে যাচ্ছে, কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে- এর জবাবদিহি না থাকাই সহিংসতাকে আরও সহজ করে তোলে।

এ সময় ডিপফেক ও ভুল তথ্যের বিস্তার পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাত এখন আর শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ছড়িয়ে পড়েছে মোবাইল স্ক্রিনে। একটি ভুয়া ভিডিও কিংবা গুজব মুহূর্তেই আগুনে ঘি ঢালতে পারে। বাস্তব সহিংসতার আগে এখন ডিজিটাল উত্তেজনা তৈরি হয়, যা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের প্রস্তুতি প্রশ্নবিদ্ধ।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫০টির বেশি হামলার তথ্য আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার সবচেয়ে নগ্ন চিত্র। নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুরা কেন টার্গেটে পরিণত হন- এই প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবারই উত্তরহীন থেকে যায়। নিরাপত্তার ঘাটতি আর দায়মুক্তির সংস্কৃতি মিলেই তাদেরকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ঠেলে দেয়।

এই পরিস্থিতির দায় কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তপশিল ঘোষণার পর সহিংসতা বাড়ার এই পুরোনো চিত্র জেনেও কমিশনের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। শক্ত বার্তা আর দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব সহিংসতার সাহস বাড়ায়।

রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মসমালোচনাও এখানে অনিবার্য। সহিংসতায় জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব কম। বরং অনেক সময় সহিংসতাকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। এতে সহিংসতার নৈতিক সীমারেখা পুরোপুরি মুছে যায়।

সমাধান কী? প্রথমত, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধই হতে হবে বিচারের মাপকাঠি। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনকে আরও দৃঢ় ও সক্রিয় হতে হবে। তপশিল ঘোষণার পর মাঠের বাস্তবতা অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দেখাতে হবে।

একই সঙ্গে ডিজিটাল গুজব মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হয়। সংখ্যালঘু নিরাপত্তাকে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার মূল অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। আলাদা করে নয়, সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরেই তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে বলতে হয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনো সংস্কারই টেকসই হয় না। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়, এটি সহনশীলতা ও নিয়ম মানার চর্চা। টিআইবির প্রতিবেদন আমাদের সামনে কেবল সহিংসতার হিসাব তুলে ধরেনি, এটি একটি সতর্ক সংকেত দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এবার সেই সংকেত শুনব, নাকি আরও কিছু মৃত্যুর পর আবার নতুন করে উদ্বেগ জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করব?

লেখক: কলামিস্ট ও গণমাধ্যমকর্মী।