সিলিকন ঢাল, চিপযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

সেমিকন্ডাক্টর: একবিংশ শতাব্দীর তেল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হৃদস্পন্দন এবং নতুন সভ্যতার ভিত্তি

Any Akter
কাজী জিয়া উদ্দিন
প্রকাশিত: ১২:৫৬ অপরাহ্ন, ২৬ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২:০৮ অপরাহ্ন, ২৬ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত


“Control oil and you control nations; control food and you control people; control information and you control the world.”

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে: গণ-অভ্যুত্থান থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পথে

— Often attributed to Henry Kissinger

“Semiconductors are the foundation of the modern economy.”

আরও পড়ুন: হুমায়ূন আহমেদের শেষ অভিমান: ফিনিক ফোটা জোছনা ও সৃষ্টির হাহাকার

— Common policy position across leading technology economies

«“The chip is the most complex product ever manufactured by humankind.”

— Chris Miller, Chip War»

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য আলোচনার জন্ম দিয়েছে—“সেমিকন্ডাক্টর হতে পারে অর্থনীতির সম্ভাবনাময় পরবর্তী চালিকা শক্তি।”

অনেকেই এটিকে প্রযুক্তি-খাতের একটি সাধারণ বক্তব্য হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু বাস্তবে এই ধারণার ভেতরে লুকিয়ে আছে আগামী শতাব্দীর অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সভ্যতার প্রতিযোগিতার গভীরতম প্রশ্ন।

আজ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, সবচেয়ে উন্নত চিকিৎসা যন্ত্র, সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান, সবচেয়ে বুদ্ধিমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সবচেয়ে দ্রুতগতির যোগাযোগব্যবস্থা—সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র বস্তু—

সেমিকন্ডাক্টর চিপ।

বিশ্বের অর্থনীতি এখন ক্রমশ এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে যেখানে বলা যায়—

“তেল ছিল বিংশ শতাব্দীর শক্তি; সেমিকন্ডাক্টর হবে একবিংশ শতাব্দীর শক্তি।”

ইতিহাসের নতুন শক্তি

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত শক্তির উৎস পরিবর্তনের ইতিহাস।

কৃষি যুগে শক্তি ছিল জমি।

শিল্পযুগে শক্তি ছিল কয়লা।

বিশ শতকে শক্তি ছিল তেল।

একবিংশ শতাব্দীতে শক্তি ক্রমশ রূপান্তরিত হচ্ছে তথ্য, গণনাশক্তি এবং সেমিকন্ডাক্টরে।

এই কারণেই আজ বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো তেলক্ষেত্রের চেয়ে চিপ কারখানা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।

চিপ ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি কার্যত অচল।

ব্যাংকিং ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে।

স্যাটেলাইট থেমে যাবে।

মোবাইল ফোন নিষ্ক্রিয় হবে।

ইন্টারনেট ভেঙে পড়বে।

AI স্তব্ধ হয়ে যাবে।

আধুনিক রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি স্নায়ু সেমিকন্ডাক্টরের উপর নির্ভরশীল।

চিপযুদ্ধ: নতুন শীতল যুদ্ধ

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সাময়িকী The Economist কয়েক বছর আগে একটি প্রচ্ছদ প্রকাশ করেছিল—

“The Most Valuable Resource on Earth.”

সেখানে তেল নয়, আলোচনার কেন্দ্রে ছিল চিপ।

আজ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা মূলত বাণিজ্যযুদ্ধ নয়।

এটি প্রযুক্তিগত আধিপত্যের যুদ্ধ।

বিশেষত—

* উন্নত সেমিকন্ডাক্টর

* AI প্রসেসর

* কোয়ান্টাম কম্পিউটিং

* উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং

কে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই নতুন ভূ-রাজনীতি গড়ে উঠছে।

Chris Miller তাঁর বিখ্যাত Chip War গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বোঝার জন্য তেল নয়, চিপের মানচিত্র বুঝতে হবে।

তাইওয়ান: পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ?

বিশ্ব মানচিত্রে তাইওয়ান একটি ছোট দ্বীপ।

কিন্তু প্রযুক্তির মানচিত্রে এটি এক মহাদেশ।

বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের বিশাল অংশ পরিচালনা করে তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠান TSMC।

Apple, NVIDIA, AMD, Qualcomm, Broadcom—বিশ্বের অসংখ্য প্রযুক্তি জায়ান্ট এই সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।

এ কারণেই আন্তর্জাতিক কৌশলবিদেরা একটি নতুন শব্দ ব্যবহার করেন—

Silicon Shield

অর্থাৎ সেমিকন্ডাক্টরই তাইওয়ানের কৌশলগত ঢাল।

বিশ্ব অর্থনীতি তাইওয়ানের স্থিতিশীলতার সঙ্গে এতটাই জড়িত যে তার নিরাপত্তা এখন একটি বৈশ্বিক স্বার্থে পরিণত হয়েছে।

অতীতে যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের তেল বিশ্বকে সংযুক্ত করেছিল, আজ অনেকটা একইভাবে তাইওয়ানের চিপ বিশ্বকে সংযুক্ত করছে।

ASML: বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানি, যার নাম অনেকে জানেই না

নেদারল্যান্ডসের ASML এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত EUV Lithography Machine তৈরি করে।

এই যন্ত্র ছাড়া সর্বাধুনিক চিপ উৎপাদন কার্যত অসম্ভব।

প্রতিটি যন্ত্রের মূল্য শত শত মিলিয়ন ডলার।

এতে হাজারো প্রযুক্তি, হাজারো পেটেন্ট এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের অবদান রয়েছে।

একটি মাত্র যন্ত্রের মাধ্যমে ASML প্রমাণ করেছে—

একবিংশ শতাব্দীতে ভূ-রাজনীতি শুধু রাষ্ট্র দ্বারা নির্ধারিত হয় না।

কখনও কখনও একটি কোম্পানিও বৈশ্বিক কৌশলগত বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারে।

NVIDIA: নতুন যুগের স্ট্যান্ডার্ড অয়েল?

বিশ শতকে Standard Oil তেলযুগের প্রতীক ছিল।

আজ AI যুগে অনেক বিশ্লেষক NVIDIA-কে একই ধরনের প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে দেখছেন।

কারণ AI বিপ্লবের প্রায় প্রতিটি স্তরে NVIDIA-র GPU ব্যবহৃত হচ্ছে।

ChatGPT থেকে শুরু করে স্বয়ংক্রিয় যানবাহন, মহাকাশ গবেষণা থেকে ওষুধ আবিষ্কার—সবখানেই AI-চিপের চাহিদা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।

সুতরাং AI বিপ্লবের কেন্দ্রেও রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর।

Civilisation Credit: ভবিষ্যৎ শক্তির নতুন পরিমাপক

আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের রাষ্ট্রশক্তি বোঝার জন্য আমাদের নতুন একটি ধারণা প্রয়োজন—

Civilisation Credit

কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সীমাবদ্ধ নয়।

তার প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে

* জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা

* গবেষণা ও উদ্ভাবন

* প্রযুক্তিগত দক্ষতা

* প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা

* সামাজিক আস্থা

* দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

* মানবসম্পদের গুণগত মান

এই সামগ্রিক সক্ষমতার নামই Civilisation Credit।

সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এই Civilisation Credit-এর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন।

কারণ একটি উন্নত চিপ কারখানা রাতারাতি তৈরি করা যায় না।

এটি গড়ে ওঠে কয়েক দশকের শিক্ষা, গবেষণা, শৃঙ্খলা এবং জাতীয় কৌশলের উপর।

দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুরের শিক্ষা

দক্ষিণ কোরিয়া একসময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ছিল।

আজ Samsung বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি শক্তি।

জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে উন্নত ইলেকট্রনিক্স ও উপকরণ প্রযুক্তিতে বিশ্বনেতা হয়েছে।

সিঙ্গাপুর প্রাকৃতিক সম্পদহীন হয়েও উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদন ও গবেষণায় অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে।

তাদের সাফল্যের মূল রহস্য ছিল—

মানবসম্পদ।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

এবং প্রযুক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন।

বাংলাদেশের জন্য সেমিকন্ডাক্টর রোডম্যাপ 

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত না আগামীকাল TSMC হওয়া।

বরং ধাপে ধাপে একটি সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা।

প্রথম ধাপ: শিক্ষা বিপ্লব

* মাইক্রোইলেকট্রনিক্স

* ন্যানো প্রযুক্তি

* VLSI Design

* AI Hardware

* Semiconductor Physics

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দ্বিতীয় ধাপ: Fabless Bangladesh

চিপ ডিজাইন করা যায় বাংলাদেশে।

উৎপাদন হতে পারে অন্য দেশে।

ভারত এবং বহু উদীয়মান অর্থনীতি এই মডেল অনুসরণ করছে।

তৃতীয় ধাপ: জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা কেন্দ্র

ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং রাজশাহীতে বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে।

চতুর্থ ধাপ: Packaging and Testing Hub

বিশ্বব্যাপী চিপ সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্যাকেজিং ও টেস্টিং।

বাংলাদেশ এই খাতে দ্রুত প্রবেশ করতে পারে।

পঞ্চম ধাপ: AI–Semiconductor Alliance

AI এবং সেমিকন্ডাক্টরকে পৃথকভাবে দেখা যাবে না।

যে রাষ্ট্র AI ব্যবহার করবে কিন্তু চিপ প্রযুক্তি আয়ত্ত করবে না, সে দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরশীল হয়ে থাকবে।

বঙ্গোপসাগর থেকে সিলিকন উপকূল

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ ভবিষ্যতে প্রযুক্তি উৎপাদন ও ডিজাইন সেবার একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হতে পারে।

একসময় যেমন পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছিল, তেমনি আগামী কয়েক দশকে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প অর্থনীতির নতুন ভিত্তি হতে পারে।

উপসংহার: সিলিকনের শতাব্দীতে বাংলাদেশের আহ্বান

ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি জাতিকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—

সে কি ভবিষ্যতের প্রযুক্তির ভোক্তা হবে, নাকি নির্মাতা হবে?

বাংলাদেশ আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রবেশের অর্থ কেবল একটি নতুন শিল্পখাত তৈরি করা নয়।

এটি একটি নতুন জাতীয় দর্শন গ্রহণ করা।

এটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে যাত্রা।

এটি মানবসম্পদে বিনিয়োগ।

এটি গবেষণাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া।

এটি ভবিষ্যৎকে কল্পনা করার সাহস।

একদিন হয়তো ইতিহাস লিখবে—

বঙ্গোপসাগরের তীরে একটি দেশ বুঝতে পেরেছিল যে ভবিষ্যতের স্বর্ণখনি মাটির নিচে নয়, মানুষের মস্তিষ্কে।

আর সেই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের সিলিকন যুগ।

লেখক পরিচিত: কাজী জিয়া উদ্দিন। লেখক, কলামিস্ট ও সাবেক ডিআইজি