টাঙ্গুয়ার হাওরে আইনি বিধিনিষেধ ও পরিবেশের কাঠগড়ায় ভাসমান থিয়েটার
জলের ওপর নামা জোছনা, চারপাশের রূপালী জলরাশি আর মুক্ত আকাশের নিচে ধ্বনিত লোকগানের সুর- চিত্রটি প্রথম দর্শনে যেকোনো শিল্পানুরাগী মানুষের স্বপ্নের মতোই মনে হতে পারে। পূর্ণিমার এমন মায়াময় রাতে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোটে চন্দ্রাবতীর অমর লোকগাথা 'মলুয়া' উপস্থাপনের উদ্যোগটি দৃশ্যত শিল্প ও প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
লোকগাথার পুরোনো আখ্যানকে প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে নতুন শৈল্পিক পরিবেশনায় দর্শকের সামনে হাজির করার এই প্রয়াসটি প্রশংসনীয় হতে পারতো, যদি তা একটি আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত স্পর্শকাতর বাস্তুতন্ত্রের বুকে অনুষ্ঠিত না হতো। তবে এই শিল্পানুরাগের দৃশ্যমান সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পরিবেশগত বাস্তবতা ও প্রশাসনিক নিয়মনীতির চিত্রটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এক গভীর উদ্বেগের সত্য সামনে আসে। প্রকৃতির রূপরস উপভোগের নামে হাওরের পরিবেশ ও সম্প্রতি ঘোষিত সরকারি সুরক্ষানীতিকে অবজ্ঞা করার এই ঘটনা লোকসংস্কৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষার দ্বন্দ্বে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
আরও পড়ুন: রাজনৈতিক চরিত্রে মৌলিক আচরণ মরীচিকা
যেকোনো উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশনা- তা রাতের আঁধারে গহীন হাওরে নাটকের মঞ্চায়নই হোক কিংবা ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার প্রদর্শনী- কয়েকটি মৌলিক প্রযুক্তিগত আয়োজনের ওপর নির্ভর করে। রাতের ঘন অন্ধকারে হাওরের বুকে ভাসমান হাউসবোটে পুরো নাটক মঞ্চস্থ করতে প্রয়োজন হয় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম আলোকসজ্জা বা ফ্ল্যাশ লাইট। একই সাথে, উন্মুক্ত জলাশয়ে বেশ কিছুটা দূরে অবস্থানরত দর্শকদের কাছে অভিনয়শিল্পীদের সংলাপ ও বাদ্যযন্ত্রের সূক্ষ্ম ধ্বনি পৌঁছে দিতে সাউন্ড সিস্টেম, অ্যামপ্লিফায়ার এবং শক্তিশালী স্পিকারের সজোরে ব্যবহারের কোনো বিকল্প থাকে না। আপাতদৃষ্টিতে এসব আয়োজনকে যেকোনো থিয়েটার প্রদর্শনী বা বাণিজ্যিক নাট্যউৎসবের স্বাভাবিক ও আবশ্যক অনুষঙ্গ মনে হলেও, টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো পরিবেশগতভাবে অতিসংবেদনশীল 'রামসার সাইট'-এর জন্য তা এক অপূরণীয় ক্ষতির কারণ।
টাঙ্গুয়ার হাওর কেবল মানুষের বিনোদন কেন্দ্র কিংবা পর্যটনের আকর্ষণীয় গন্তব্য নয়; এটি শত শত প্রজাতির দেশি-বিদেশি অতিথি পাখি, বিরল জলজ প্রাণী এবং বিপন্ন মৎস্য সম্পদের এক সুরক্ষিত অভয়ারণ্য। স্বাভাবিকভাবেই হাওরের শান্ত ও অন্ধকার রাত বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রবাহ এবং নৈশচর প্রাণীদের জীবনের মৌলিক শর্ত। সেখানে কৃত্রিম আলোর তীব্র ঝলকানি এবং সাউন্ড সিস্টেমে উচ্চস্বরের শব্দতরঙ্গ প্রাকৃতিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, অনভিপ্রেত শব্দ ও আলো পাখির প্রজনন চক্রকে ব্যাহত করে এবং জলজ প্রাণীদের দিকভ্রান্ত করে দেয়। লোকসংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ প্রকাশের নামে প্রকৃতির এই অভয়ারণ্যে কৃত্রিমতার এমন অনুপ্রবেশ পরিবেশবিজ্ঞানের মূলনীতির স্পষ্ট বিপরীত।
আরও পড়ুন: বিরল মৃত্তিকার ধাতু: একবিংশ শতাব্দীর নতুন তেল, প্রযুক্তির শক্তি ও ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ
এই পটভূমিতে এ ধরনের আয়োজনের আইনি গ্রহণযোগ্যতা ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালার বিষয়টি সামনে চলে আসে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও হাওরাঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গত ২ আগস্ট টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ১৩ দফা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক নির্দেশ ছিল না; বরং বিগত বছরের ২১ জুনে জারি করা ১২ দফা নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় এবং গত বছরের ৬ নভেম্বরে সরকার ঘোষিত ‘টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ, ২০২৫’-এর অংশ হিসেবেই এই কঠোর বিধিমালা কার্যকর করা হয়। প্রণীত নীতিমালার স্পষ্ট শর্তাবলির মধ্যে অন্যতম হলো- হাউসবোটে যেকোনো ধরনের উচ্চ স্বরে গানবাজনা, মাইক ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার এবং পার্টির আয়োজন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। পাশাপাশি সব হাউসবোটের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহন নিষিদ্ধকরণ, সেপটিক ট্যাংক রাখা এবং নির্দিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
আইনের এই স্পষ্ট ধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যখন কোনো বাণিজ্যিক আয়োজক কিংবা ট্রাভেল এজেন্সি উন্মুক্ত হাওরে থিয়েটার বা নাটকের নামে সাউন্ড সিস্টেম ও আলো জ্বালিয়ে অনুষ্ঠান পরিচালনা করে, তখন আইন মানার সংস্কৃতি বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আয়োজকদের দাবি হতে পারে যে তারা ঐতিহ্যবাহী লোকগাথা চর্চা এবং পর্যটনে বৈচিত্র্য আনার উদ্দেশ্যেই এটি করেছেন; কিন্তু কোনো ব্যক্তিগত বা সাংস্কৃতিক উদ্যোগই রাষ্ট্র ও প্রশাসন প্রণীত সুরক্ষা আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।
হাওরের বুকে রাতে সজোরে ধ্বনিত সংলাপ ও বাদ্যযন্ত্রের সুর নিশ্চয়ই প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করেই পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে দর্শকের কর্ণে পৌঁছেছে। আইন যদি সাধারণ পর্যটকদের মাইক ও উচ্চশব্দে গান বাজানো থেকে বিরত রাখতে কার্যকর হয়, তবে থিয়েটারের ছদ্মবেশে কিংবা নতুন কোনো মোড়কে সেই একই আইনের ব্যত্যয় কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?
এই সংকটটি কেবল আয়োজকদের আইন অমান্য করার মানসিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি ও জবাবদিহিতার দুর্বলতাকেও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে। জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এই ধরনের সংবেদনশীল ইসিএ (ECA) এলাকায় গীতিনাট্য মঞ্চস্থ করার জন্য আয়োজকরা কোনো প্রশাসনিক পূর্বানুমতি নেয়নি কিংবা প্রশাসনের সাথে কোনো যোগাযোগও করেনি। তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বক্তব্যেও উঠে এসেছে অজ্ঞতার চিত্র- তিনি উল্টো সাংবাদিকের কাছ থেকেই তথ্য জানার চেষ্টা করেছেন যে অনুষ্ঠানটি কোথায় ও কীভাবে সংগঠিত হলো। যেখানে হাওরে পর্যটকদের সুরক্ষায় সেপটিক ট্যাংক, লাইফ জ্যাকেট ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি করার দায়িত্ব প্রশাসনের, সেখানে রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে হাওরে যে কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজনে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে কৃত্রিম আলো ও উচ্চশব্দের এই বিশাল আয়োজন স্থানীয় প্রশাসনের নজর এড়িয়ে যাওয়া কেবল হতাশাজনকই নয়, বরং তদারকির চরম ব্যর্থতারই পরিচয় দেয়। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি এমন বাণিজ্যিক ও পরিবেশবিধ্বংসী আইন লঙ্ঘনে নীরব ভূমিকা পালন করে, তবে সুরক্ষা আদেশ ও ১৩ দফা নির্দেশনার কার্যকরিতা নিছক কাগুজে নীতিমালাই থেকে যাবে।
প্রশাসনিক এই স্থবিরতার পাশাপাশি আরেকটি আশঙ্কাজনক দিক হলো স্থানীয় গণমাধ্যমের নীরবতা। সুনামগঞ্জের স্থানীয় পত্রিকাগুলো যেখানে সাধারণত সাধারণ মানুষের হাঁড়ির খবরও অনুসন্ধান করে বের করে আনে, সেখানে টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকে এত বড় একটি অবৈধ বাণিজ্যিক উৎসব হয়ে গেল, অথচ স্থানীয় গণমাধ্যমে বিষয়টি সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হলো। একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইনে খবরটি প্রকাশের পরই কেবল বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
প্রশ্ন ওঠে, স্থানীয় সাংবাদিকরা কি অজ্ঞতার কারণে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন, নাকি কোনো বিশেষ সুবিধা কিংবা স্বার্থের বিনিময়ে এই পরিবেশবিধ্বংসী সংবাদটিকে আড়াল করতে চেয়েছেন? ওয়াচডগ বা সমাজের পাহাদার হিসেবে গণমাধ্যমের যে প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক দায়িত্ব থাকার কথা ছিল, এই নীরবতা নিশ্চিতভাবেই সেই সাংবাদিকতার নীতিগত অবস্থানের এক বড় ধরনের স্খলন নির্দেশ করে।
অবশ্য, সংস্কৃতি চর্চা এবং পরিবেশ রক্ষা একে অপরের পরিপন্থী হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। টেকসই পর্যটন (Eco-tourism) এবং দায়িত্বশীল সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে এই দুটির মধ্যে একটি ইতিবাচক সমন্বয় ঘটানো সম্ভব। হাওরাঞ্চলে লোকগাথা ও লোকসঙ্গীত নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তবে এই পরিবেশনাগুলোর জন্য গহীন হাওরের অভয়ারণ্যকে নির্বাচিত না করে হাওরসংলগ্ন স্থলভাগের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ বা ঐতিহ্যবাহী লোকমঞ্চ ব্যবহার করা যেতে পারে।
খুব প্রয়োজন হলে আধুনিক 'সাইলেন্ট হেডফোন থিয়েটার' প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে শব্দের তরঙ্গ হাওরের শূন্যতায় ছড়িয়ে পড়ে প্রাণীকূলের ক্ষতি করবে না এবং দর্শকরাও স্বাচ্ছন্দ্যে তা উপভোগ করতে পারবেন। শিল্পকে উপস্থাপনের জন্য প্রকৃতির বুক চিরে উচ্চশব্দের ব্যবহার কখনোই একমাত্র পথ হতে পারে না।
পরিশেষে, হাওরে রাতের আঁধারে এমনকি দিনের বেলাতেও ভাসমান মঞ্চে নাটক কিংবা যাত্রাপালা কিংবা কোনও রাজনৈতিক সভা-সমিতির উৎসব-পরিবেশনা রাষ্ট্র ও প্রশাসন প্রণীত আইনি নীতিমালার সাথে স্পষ্টভাবেই সাংঘর্ষিক। লোকশিল্পকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ যত গভীরই হোক না কেন, তা যেন প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে ধ্বংসের বিনিময়ে না হয়।
প্রশাসনের উচিত এই অবৈধ আয়োজনের সুষ্ঠু তদন্ত করা এবং ভবিষ্যতে হাওরের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তা বজায় রাখতে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। একইসাথে গণমাধ্যমকেও তার বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা পুনপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংস্কৃতিকে প্রকৃতির বন্ধু হিসেবে গড়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য, তার ধ্বংসের কারণ নয়।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিস্ট





