পুলিশের ওপর সশস্ত্র হামলা: ‘কবজিকাটা আনোয়ার’ চক্রের সেকেন্ড ইন কমান্ডসহ গ্রেপ্তার ৬

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৮:০৭ অপরাহ্ন, ১৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৮:০৭ অপরাহ্ন, ১৭ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীর আদাবরে ছিনতাই প্রতিরোধে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের ওপর সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ‘কবজিকাটা আনোয়ার’ চক্রের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত আবু সাইদসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-২। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, হামলাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল। ঘটনার পর অপরাধী নেটওয়ার্ক ভাঙতে যৌথ অভিযানে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

রাজধানীর আদাবর এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় আলোচিত ‘কবজিকাটা আনোয়ার’ গ্রুপের অন্যতম শীর্ষ সদস্য আবু সাইদসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-২। গ্রেপ্তার আবু সাইদকে সংগঠনটির ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

আরও পড়ুন: কামরাঙ্গীরচরে যুবক খুন, ৪ ঘণ্টার মধ্যেই দুই ঘাতক গ্রেপ্তার

বুধবার র‌্যাব-২ থেকে পাঠানো এক বার্তায় জানানো হয়, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের ধরতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের আটক করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে।

পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানায়, মঙ্গলবার আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় এক বিকাশ এজেন্টের কাছ থেকে টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই আদাবর থানা পুলিশ অভিযানে নামে। একপর্যায়ে ছিনতাইকারীরা পুলিশের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালায় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এতে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম ও উপপরিদর্শক (এসআই) তরুণ আহত হন।

আরও পড়ুন: বিআরটিএ ওয়েবসাইট ক্লোন করে প্রতারণা, ৩ সদস্য গ্রেপ্তার

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালালে দুই হামলাকারী গুলিবিদ্ধ হয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ দুজনসহ মোট চারজনকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার সঙ্গে জড়িতরা কুখ্যাত ‘কবজিকাটা আনোয়ার’ চক্রের সক্রিয় সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলা এই চক্রের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, কুপিয়ে জখম এবং হত্যাসহ এক ডজনের বেশি মামলা রয়েছে। প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য হাতের কবজি কেটে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ থেকে স্থানীয়ভাবে ‘কবজিকাটা আনোয়ার’ নামে পরিচিতি পায় চক্রটি।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনোয়ার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেও অপরাধী নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। বরং বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে সদস্যরা এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি তদন্ত কর্মকর্তাদের। বর্তমানে ‘অ্যাক্সেল বাবু’ নামে পরিচিত আরেক সন্ত্রাসীর নেতৃত্বে চক্রটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা জানিয়েছেন, হামলায় আহত দুই পুলিশ সদস্য বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত রয়েছেন। তারা প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।

এদিকে ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর ও আদাবর রাজধানীর অন্যতম অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এলাকায় অর্ধশতাধিক অপরাধী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১৭টি বড় চক্র নিয়মিতভাবে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা এবং ভাড়াটে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত।

পুলিশ বলছে, এসব গ্রুপের প্রতিটিতে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ জন সদস্য থাকে এবং তাদের প্রধান অর্থের উৎস অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এলাকায় সক্রিয় বড় চক্রগুলোর মধ্যে পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, অ্যালেক্স গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, লেও ঠেলা গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর গ্রুপ, নবী গ্রুপ ও আকবর গ্রুপ উল্লেখযোগ্য।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। আদাবরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধী নেটওয়ার্কের অর্থায়ন, অস্ত্রের উৎস এবং নেতৃত্ব কাঠামো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।