ইউপি ভোটের ৭ ধাপের সময়সূচি নিয়ে ধোঁয়াশা

Sadek Ali
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৬:২০ অপরাহ্ন, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৭:২৯ অপরাহ্ন, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

#১৭ সেপ্টেম্বর অংশীজনের বৈঠকের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

# ঘোষিত সময়সূচীকে আপাতত ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা

আরও পড়ুন: ১২ নভেম্বর থেকে শুরু স্থানীয় সরকার নির্বাচন: ইসি

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের যে সম্ভাব্য সময়সূচি নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছিল, সেটি এখনো চূড়ান্ত নয়। বরং এটিকে একেবারেই প্রাথমিক বা টেন্টেটিভ সময়সূচি হিসেবে উল্লেখ করেছে ইসি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর বৈঠকের পরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় ও ধাপের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে ইউপি নির্বাচন নিয়ে সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কার্যকর সমন্বয় হয়েছে কি না, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গতকাল সোমবার ইসির পক্ষ থেকে কয়েক ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশের পর আজ মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, এ বিষয়ে সরকার কিছুই জানে না। তাঁর দাবি, ইসির সঙ্গে সরকারের কোনো পত্র যোগাযোগ বা অন্য কোনোভাবে আলোচনা হয়নি। এর পরপরই ইসির অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ।

আরও পড়ুন: কারা অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল

আজ মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আখতার আহমেদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে—এটি নিশ্চিত। তবে নির্বাচন কবে, কী পদ্ধতিতে এবং কোন পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কমিশনে গত দুই দিন ধরে এ নিয়ে প্রাক্‌-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল একটি প্রাথমিক সময়সূচি তৈরি করা হয়।

ইসি সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই প্রাথমিক পরিকল্পনায় পাঁচটি ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। এর বাইরে আরও দুটি ধাপ রিজার্ভ রাখা হয়েছে। ফলে মোট সাতটি ধাপের সম্ভাব্য কাঠামো সামনে এলেও এর কোনোটিই এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত নির্বাচনী সময়সূচি নয়।

আখতার আহমেদ বলেন, ‘এটি একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি।’ আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রয়োজনীয় মতামত ও ইনপুট নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে।

সরকারের বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন: 

ইউপি নির্বাচন নিয়ে ইসির প্রাথমিক সময়সূচি প্রকাশের পর আজ সকালে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে নির্বাচন কমিশন কয়েক ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। এমনকি সরকারের সঙ্গে ইসির কোনো পত্র যোগাযোগ বা অন্য কোনোভাবে আলোচনা হয়নি বলেও জানান তিনি।

সরকারের দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রকাশের আগে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের পরিধি কতটুকু ছিল। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রয়োজনীয় জনবল ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলো সরাসরি সংশ্লিষ্ট থাকায় এ ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে সুস্পষ্ট যোগাযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু সময় পর ইসি সচিব সাংবাদিকদের সামনে কমিশনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, গতকালই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। তবে সাংবাদিকদের কৌতূহলের কারণে বিষয়টি স্পষ্ট করছেন তিনি।

সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে আখতার আহমেদ বলেন, আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। কার সঙ্গে কখন এবং কীভাবে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে এই মুহূর্তে বাড়তি কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি নন।

পাল্টা মন্তব্যে ‘নো কমেন্টস’ : 

ইউপি নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে ইসি সচিবের মন্তব্য জানতে চান সাংবাদিকেরা। তবে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিপরীতে কোনো পাল্টা বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

আখতার আহমেদ বলেন, ‘উনি যেটা বলেছেন, সেটা শিরোধার্য। তবে এ বিষয়ে পাল্টা কোনো মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমি দেখাব না। নো কমেন্টস ফ্রম মাই সাইড।’

তাঁর এই বক্তব্যে আপাতত সরকারের সঙ্গে ইসির সমন্বয় নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি। বরং ১৭ সেপ্টেম্বরের অংশীজন বৈঠকের দিকেই এখন নজর থাকছে। ওই বৈঠকে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন আয়োজনের কাঠামো ও সময় নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কমিশনের: 

মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর প্রয়োজনীয় ইনপুট পাওয়ার ভিত্তিতে কমিশনই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবে।

অর্থাৎ, গতকাল যে সম্ভাব্য সময়সূচি সামনে এসেছে, সেটিকে এখনই ইউপি নির্বাচনের চূড়ান্ত তফসিল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কমিশনের নিজস্ব প্রাক্‌-প্রস্তুতিমূলক আলোচনায় তৈরি ওই পরিকল্পনা অংশীজনদের মতামতের পর পরিবর্তিতও হতে পারে।

ইসি সচিবের বক্তব্যে একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট—স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত থেকে কমিশন সরে আসেনি। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তবে তার সময়, ধাপ, পদ্ধতি ও পর্যায় নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু একটি প্রশাসনিক আয়োজন নয়; এটি তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান প্রক্রিয়া। ফলে নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ থেকে শুরু করে প্রস্তুতি ও আয়োজন—প্রতিটি পর্যায়েই স্বচ্ছতা, অংশীজনের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।

এ অবস্থায় সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের সঙ্গে ইসির যোগাযোগের প্রশ্নটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং সম্ভাব্য সাত ধাপের কাঠামো কতটা পরিবর্তিত হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

তবে চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণার আগে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, রাজনৈতিক দল, প্রশাসনসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত কতটা গুরুত্ব পায়, তার ওপরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি ও গ্রহণযোগ্যতার বড় একটি অংশ নির্ভর করবে।