থামেনি অভিনয়ের পথচলা
৮২তম জন্মদিনে আবুল হায়াত
বয়স ৮২, কিন্তু অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসায় কোনো ভাটা নেই। জীবনের আট দশক পেরিয়েও ক্যামেরার সামনে নিয়মিত আবুল হায়াত। প্রায় ছয় দশকের অভিনয়জীবনে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে অসংখ্য চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেছেন এই গুণী শিল্পী। আজ তার ৮২তম জন্মদিন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জন্মদিন পালন করছেন আবুল হায়াত। বিশেষ কোনো আয়োজন না থাকলেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই দিনটি কাটানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। মজার বিষয় হলো, একই দিনে জন্মদিন তার নাতনি শ্রীষারও। তাই দিনটির বড় একটা সময় নাতনিকে নিয়ে কাটাবেন এই অভিনেতা। পরিবারের অন্য সদস্যরাও থাকবেন তাদের সঙ্গে।
আরও পড়ুন: নতুন সিনেমায় যুক্ত হলেন মৌসুমী
১৯৪৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন আবুল হায়াত। তার পুরো নাম খন্দকার মোহাম্মদ শামসুল আরেফিন আবুল হায়াত গোলাম মাহবুব। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের কাছে অবশ্য ‘রবি’ নামেই বেশি পরিচিত তিনি। এই ডাকনামটি দিয়েছিলেন তার বাবা।
দেশভাগের সময় তার পরিবার মুর্শিদাবাদ ছেড়ে চট্টগ্রামে চলে আসে। সেখানেই শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কাটে তার। ১৯৬২ সালে বুয়েটে ভর্তি হয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর ঢাকা ওয়াসায় প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন: গান্ধীর চরিত্রে মনোজ বাজপেয়ী, প্রকাশ্যে প্রথম ঝলক
তবে পেশাজীবনের পাশাপাশি অভিনয়ের প্রতি আগ্রহও তখন বাড়তে থাকে। পারিবারিকভাবে সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ থাকায় ছোটবেলা থেকেই এ জগতের প্রতি টান ছিল তার। ষাটের দশকের শেষ দিকে অভিনয়ে যাত্রা শুরু করে ১৯৬৯ সালে ‘ইডিপাস’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশনে আত্মপ্রকাশ করেন আবুল হায়াত।
সেই শুরু, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রায় ৬০ বছরের অভিনয়জীবনে নাটক, সিনেমা ও মঞ্চে অসংখ্য জনপ্রিয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’, ‘বহুব্রীহি’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘আজ রবিবার’, ‘হাউজফুল’ ও ‘এফএনএফ’-এর মতো নাটকে তার অভিনয় দর্শকের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
চলচ্চিত্রেও রয়েছে তার সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার। ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘জয়যাত্রা’, ‘রূপকথার গল্প’, ‘অজ্ঞাতনামা’, ‘ফাগুন হাওয়ায়’ ও ‘রাত জাগা ফুল’সহ বহু সিনেমায় দেখা গেছে তাকে।
অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাণ ও লেখালেখিতেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন আবুল হায়াত। নাটক ও টেলিছবি নির্মাণের পাশাপাশি লিখেছেন উপন্যাস এবং আত্মজীবনী। সৃজনশীলতার একাধিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কাজ করে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন তিনি।
ব্যক্তিজীবনে ১৯৭০ সালে বিয়ে করেন আবুল হায়াত। তার বড় মেয়ে বিপাশা হায়াত অভিনয় ও লেখালেখির মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সুপরিচিত। ছোট মেয়ে নাতাশা হায়াতও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার দুই মেয়ের জীবনসঙ্গীও দেশের পরিচিত অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা—তৌকীর আহমেদ ও শাহেদ শরীফ খান।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও একুশে পদকসহ পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। তবে পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রাপ্তি হিসেবে দর্শকের ভালোবাসাকেই সামনে রাখেন তিনি।
জীবনের ৮২তম বসন্তে দাঁড়িয়েও অভিনয় থেকে দূরে সরে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই আবুল হায়াতের। বরং কাজের মধ্যেই নিজের আনন্দ খুঁজে নেওয়া এই শিল্পীর দীর্ঘ পথচলা প্রমাণ করে—প্রতিভার সঙ্গে নিষ্ঠা ও ভালোবাসা থাকলে বয়স কখনো সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।





