উত্তাল দিল্লিতে গণগ্রেফতার

Sanchoy Biswas
খোদাকাত হাসান
প্রকাশিত: ১০:৫৩ অপরাহ্ন, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:৫০ পূর্বাহ্ন, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং ভোটার তালিকার বিশেষ ব্যাপক পুননিরীক্ষণ (এসআইআর) কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো দেশজুড়ে আন্দোলন তীব্র করে তুলেছে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থল কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে প্রস্তাবিত ‘তেরঙ্গা মিছিল’ বাতিল করতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে নোটিশ পাঠিয়েছে এবং গণগ্রেফতার চালিয়েছে দিল্লি পুলিশ। কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্ক ও রাজীব চক মেট্রো স্টেশনে বসানো হয় নতুন সিসিটিভি ক্যামেরা । পাশাপাশি নয়াদিল্লি ও আশপাশের এলাকায় মোতায়েন হয়েছে ২৫ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য। 

জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে জারি করা হয়েছে ১৬৩ ধারা। কনট প্লেসের অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা পালিকা বাজারের সামনে একাধিক বাস রাখা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সংসদ মার্গ ও টলস্টয় রোডের মধ্যবর্তী এলাকায় এ ধরনের প্রায় ১৬টি বাস দেখা গেছে। 

আরও পড়ুন: দিল্লিতে কর্মসূচির আগেই আটক অভিজিৎ দীপকে ও বামপন্থী নেত্রী নেহা বোরাকে

গত সপ্তাহেও সিজেপির একই ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কনট প্লেসে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ভোটার তালিকা বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে আসছে সিজেপি। চলতি সপ্তাহের শুরুতে দলটির নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে সংগঠনটি। 

শুক্রবারের এই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’। বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান হিসেবে যন্তর মন্তরকে বাদ দেওয়ার পর সিজেপি কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে সমাবেশের ডাক দিয়েছে। এতে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী নেহা বোরা এবং আম আদমি পার্টিও অংশ নেবে বলে জানা গেছে। নতুন কর্মসূচিকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার দিল্লি পুলিশ সাধারণ মানুষকে সেন্ট্রাল পার্কে জমায়েত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। 

আরও পড়ুন: রাজনৈতিক অঙ্গনে কাউকে বিশ্বাস করেন না ট্রাম্প

অন্যদিকে, নয়াদিল্লি পৌর পরিষদ (এনডিএমসি) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সিজেপির মিছিলের পরিপ্রেক্ষিতে ‘প্রশাসনিক কারণে’ শুক্রবার ও শনিবার সেন্ট্রাল পার্ক জনসাধারণের জন্য বন্ধ থাকবে। তবে পুলিশের জারি করা নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পালন করার ঘোষণায় অনড় রয়েছেন তিনি। 

গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টায় এই প্রতিবাদ মিছিলের সূচি রয়েছে। যন্তর মন্তরে ঢুকে ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর অভিযোগে দলটির দুই শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে গ্রেফতার এবং কারাদণ্ড দেওয়ার প্রতিবাদে এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছে সিজেপি। 

দিল্লি পুলিশের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কারণে কনট প্লেস ও তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে এবং ১৬ ও ১৭ অক্টোবর সেন্ট্রাল পার্ক সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। তা সত্ত্বেও অভিজিৎ দীপকে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের এই মিছিলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি কমিটির সুপারিশ এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের মৌখিক পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে দিল্লি পুলিশ ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভের জন্য নির্ধারিত স্থান হিসেবে বাতিল (ডি-নোটিফাই) ঘোষণা করে। বিক্ষোভের বিকল্প স্থান হিসেবে দিল্লির রামলীলা ময়দান, বুরারি গ্রাউন্ড এবং সিবিডি গ্রাউন্ডকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবন, সংসদ ভবন ও সুপ্রিম কোর্টের কাছাকাছি এলাকা থেকে গণবিক্ষোভ দূর করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই নতুন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যন্তর মন্তরে প্রবেশ করে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন সিজেপির দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। পরবর্তী সময়ে আদালত তাঁদের পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠায়। 

গতকাল করোল বাগে এনসিপি (এসপি) নেতার বাসভবনে অবস্থানরত অভিজিৎ দীপকেকে এক পুলিশ কর্মকর্তা নোটিশটি হস্তান্তর করেন। নোটিশ পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও মিছিল বাতিলের আরজি প্রত্যাখ্যান করেছেন সিজেপি প্রধান। গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অভিজিৎ দীপকে প্রশ্ন তোলেন, আমরা যদি ১০০টি জায়গায় বিক্ষোভের ঘোষণা দিই, তবে কি নরেন্দ্র মোদি ১০০টি স্থানই বন্ধ করে দেবেন? জাতীয় পতাকা ওড়ানো নিয়ে দিল্লি পুলিশের সমস্যা কোথায়?’ 

অভিজিৎ দীপকে আরও বলেন, আজ রাতে বা আগামীকাল সকালে দিল্লি পুলিশ আমাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে। দেশের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর জন্য যদি জেলে যেতে হয়, তবে আমরা তার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। চাইলে আমাকে ফাঁসি দিন বলেন অভিজিৎ দিপকে। 

এদিকে, ভারতের দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সরকার অস্থিতিশীল করার চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তার দাবি, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা’ তৈরি করে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনার আদলে ভারতে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বিরোধীরা। 

গতকাল শুক্রবার লখনৌতে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন তিনি। রাজনাথের দাবি, নির্বাচনী সংস্কার ও নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রমের বিরোধিতার নামে তরুণদের রাজনৈতিক সংঘাতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের তরুণদের বিশৃঙ্খলার রাজনীতিতে দাবার ঘুঁটি বানানোর চেষ্টা চলছে। কেউ কেউ বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে মডেল হিসেবে নিয়ে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করছে বলে প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছে। আবার কেউ সরাসরি সরকার পতনের ডাক দিচ্ছে। 

রাজনাথের ভাষ্য, বিরোধীদের লড়াই নির্বাচনী সংস্কার, এসআইআর কিংবা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নয়। বরং দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে ক্ষমতা দখল করাই তাদের উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এদিন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকেও আক্রমণ করেন রাজনাথ সিং। তার অভিযোগ, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে রাহুল রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করছেন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন। রাজনাথ সিং বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থে ভারতের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলির পাঁঠা বানানো যাবে না। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বা রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী আচরণের মাধ্যমে ভারতের উন্নয়নযাত্রা বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব নয়। বিঘ্ন সৃষ্টির রাজনীতি বাদ দিয়ে রাহুল গান্ধীর উচিত জনগণের রায়কে সম্মান করা এবং নিজের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা করা। ভোটার তালিকায় অনিয়ম নিয়ে রাহুল গান্ধীর অভিযোগেরও জবাব দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। রাজনাথের দাবি, ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগের পক্ষে কংগ্রেস কোনো আনুষ্ঠানিক আপিল করেনি। কারণ, এসব অভিযোগের পক্ষে তাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। এছাড়া ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও ভোটার তালিকা পুননিরীক্ষণ কার্যক্রমের (এসআইআর) বিরুদ্ধে বিরোধী জোটের প্রতিবাদ দিন দিন জোরালো হচ্ছে। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে একটি সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক সংগঠন এই আন্দোলন মুখ হয়ে উঠলেও বিরোধী দলগুলো এখন প্রকাশ্যে তাদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর কড়া সমালোচনা করেছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জাতীয় সাধারণ সম্পাদক স্মৃতি ইরানি। 

তিনি অভিযোগ করেছেন, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা সরকার বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সঙ্গে আলোচনার পথ এড়িয়ে ‘মবোক্রেসি’-এর মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তন করতে চান। সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে দেওয়া একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি এই মন্তব্য করেন। স্মৃতি ইরানি দাবি করেন, ২০২৫ সালে রাহুল গান্ধী প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তার লড়াই বিজেপির বিরুদ্ধে নয়, বরং ‘ভারতীয় রাষ্ট্রের’ বিরুদ্ধে। 

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ভারতীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলতে কী বোঝায়? তা হলো ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো। আর এই গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সচল রাখে ভারতের নির্বাচন কমিশন। অথচ রাহুল গান্ধী অনবরত এই নির্বাচন কমিশনকেই আক্রমণ করে যাচ্ছেন। সাক্ষাৎকারে বিজেপির এই শীর্ষস্থানীয় নেত্রী অভিযোগ করেন, রাহুল গান্ধী মনে করেন দেশকে শাসন করা তাঁর ‘জন্মগত অধিকার’। স্মৃতি ইরানি বলেন, ‘নিজের সেই ধারণা পোষণ করায় তাঁর অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে তিনি কি আইন ভাঙতে পারেন? তিনি কি সহিংসতায় উসকানি দিতে পারেন? 

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিরোধীদের উদ্দেশ্য যে স্বচ্ছতা রক্ষা নয়, বরং কেবল ক্ষমতা পরিবর্তন করা, তা রাহুল গান্ধীর সহযোগীরাও সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করেছেন। এই আন্দোলনে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপের’ সম্ভাবনা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে স্মৃতি ইরানি দাবি করেন, কংগ্রেসের নেতারা আগেও বিভিন্ন দেশে গিয়ে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য বিদেশি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কংগ্রেস নেতারা এমনকি রাহুল গান্ধী নিজেও বিদেশ সফরকালে মন্তব্য করেছেন যে তাদের সাহায্যের প্রয়োজন। এটি কি একজন দায়িত্বশীল বিরোধীদলীয় নেতার আচরণ হতে পারে?