মজুত বাড়াচ্ছে সরকার
মার্কিন অর্থনৈতিক যুদ্ধ মোকাবিলায় স্বনির্ভরতার ওপর জোর ইরানের
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি সচল রাখার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ইরান। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে দেশটির অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেন, সরকার অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে দুই বছরের একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
আরও পড়ুন: নেপালে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে নিহত বেড়ে ১৫৭, নিখোঁজ ৪০৩
তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় ইরানের নিজস্ব কৌশল ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বের একমাত্র প্রভাবশালী শক্তি নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি অনেক দেশ কার্যকরভাবে প্রত্যাখ্যান করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মজুত বাড়াচ্ছে সরকার
আরও পড়ুন: ভয়াবহ বন্যায় তছনছ নেপালের রসুয়া, নিহত ৯৫, নিখোঁজ শত শত পর্যটক
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণ মজুত করাকে ইরান সরকারের অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম সম্পদসমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিং করতে হচ্ছে ইরানকে।
দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি চলতি সপ্তাহে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, ইরানের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস তেল রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে তিনি দাবি করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার সংকট নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এমন জায়গায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুত রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নেই।
হেম্মাতি স্বীকার করেন, মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো গুরুতর সমস্যা রয়েছে। তবে কষ্টের মধ্যে থাকা আর অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়া এক বিষয় নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি মঙ্গলবার জানান, আগামী এক বছরে দেশের পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হবে—এমন প্রত্যাশা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে দেশটিতে দারিদ্র্যের পরিমাণ নিয়ে সরকারি তথ্য প্রকাশের আগে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
এর মধ্যেই মঙ্গলবার খোলা বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দর নেমে সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। এক ডলারের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ ৫০ হাজার রিয়াল। বুধবার অবশ্য কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় রিয়াল।
দেশে উৎপাদনে জোর
চলমান সংকটের মধ্যেও ইরানের নতুন নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাই তরুণদের দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়ে নিজেদের পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয় পণ্য দেশে উৎপাদনের আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের নীতিনির্ধারণে বহু বছর ধরেই ‘স্বনির্ভরতা’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোতে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশ ইরান বর্তমানে নিজেদের কৃষিপণ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ উৎপাদন করতে পারে বলে সরকারের দাবি। তবে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে দেশটির ভয়াবহ পানি সংকট আরও বাড়ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী গোলাম-রেজা নুরি মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, স্বল্পমেয়াদে খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতার হার ৯০ শতাংশে উন্নীত করতে চায় সরকার। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় সব খাদ্যপণ্যই দেশে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
তবে খাদ্য আমদানিতে এখনও ইরানকে বড় ধরনের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দেশটি গম, ভুট্টা, চাল ও ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) জানিয়েছে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন সংকট এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ইরানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ঘাটতি পূরণ করার মতো সক্ষমতা স্থলপথের বাণিজ্যিক রুটগুলোর নেই বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের সর্বশেষ হিসাবে, জুলাইয়ে দেশটিতে খাদ্যের দাম এক বছর আগের তুলনায় ১২৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
ওষুধ ও জ্বালানি সংকট
ইরান সরকার দাবি করে, দেশের প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রায় ৯৭ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। তবে মোট ওষুধ ব্যয়ের বড় অংশ এখনও আমদানি করা ওষুধের পেছনে চলে যায়।
ইরানের পার্লামেন্টের স্বাস্থ্য কমিটির মুখপাত্র সালমান ইশাগি মে মাসে জানিয়েছিলেন, প্রায় ১ হাজার ধরনের ওষুধে কোনো না কোনো মাত্রায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওষুধের দামও দ্রুত বেড়েছে।
যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো দ্রুত মেরামতের চেষ্টা করছে ইরান সরকার। তবে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি যুক্ত হওয়ায় দেশটির জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়লে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মঙ্গলবার ও বুধবার তেহরান, মাশহাদ, কারাজসহ বিভিন্ন শহরের বেশ কিছু পেট্রল স্টেশনে সরকারি বরাদ্দের জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এতে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়।
সরকারের মুখপাত্র মোহাজেরানি বুধবার জানিয়েছেন, আগামী ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্তমান জ্বালানির দাম ও বরাদ্দ অপরিবর্তিত থাকবে। তবে ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য জ্বালানির কোটা ইতোমধ্যে কমানো হয়েছে।
ইরানের ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল রিফাইনিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলে দুটি নতুন তেল শোধনাগার চালু হলে প্রতিদিন দেশটির জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লিটার বাড়বে।
কঠিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের আশঙ্কা
ইরানের অর্থনীতিবিদ সাদেক আলহোসেইনি সতর্ক করে বলেছেন, বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা এড়াতে সরকারকে জ্বালানির দাম বাড়ানোসহ কিছু ‘কঠিন সংস্কার’ করতে হতে পারে।
তার মতে, জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা এবং অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা আরও বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। এমনিতেই দেশটির বহু মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের চাপ সামলে ইরান অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশটির সম্পদ ও উৎপাদন সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।





