ইরানের ৫ তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলা, জর্ডানে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:১৬ পূর্বাহ্ন, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১০:১৬ পূর্বাহ্ন, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওমান উপসাগর ও খার্গ দ্বীপের আশপাশে এসব হামলা চালানো হয়। এর আগে ইরান দুই দিনের মধ্যে দুইবার মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করেছে—এমন অভিযোগ তোলে ওয়াশিংটন।

গতকাল (৮ সেপ্টেম্বর) মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডানে অবস্থিত আল-আজরাক ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। একই সঙ্গে অঞ্চলটির আরও দুটি মার্কিন নৌযান ও আটটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর দাবি করেছে তেহরান। এসব হামলায় ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে বলেও দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।

আরও পড়ুন: তিব্বতে ৫.৩ মাত্রার ভূমিকম্প, নেপালেও কম্পন

উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই নতুন করে এই পাল্টাপাল্টি হামলা হলো। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত ছয় মাসে গড়িয়েছে। এ সময় হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছে তেহরান। অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করছে ওয়াশিংটন।

গতকাল সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৪৬ ডলারে উঠে যায়।

আরও পড়ুন: ইরানি হামলায় মার্কিন দুই জাহাজ ও ৮ ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত

মার্কিন হামলার ব্যাখ্যা

এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, গত দুই দিনে ইরানের আইআরজিসি একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে দুই দফায় হামলার লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করেছে। তবে মার্কিন নৌযানটি সফলভাবে দুই হামলাই এড়িয়ে যায়। এতে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি বলেও জানানো হয়েছে।

এরপর পাল্টা অভিযান চালিয়ে ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজে হামলা করা হয় বলে জানিয়েছে সেন্টকম। এগুলো হলো—এম/টি কাভিজ, এম/টি চারমিনার, এম/টি হরাইজন-১ এবং এম/টি রিয়েস্কো; এগুলো ওমান উপসাগরে ছিল। আর এম/টি দেরিয়া নামের আরেকটি ট্যাংকারে খার্গ দ্বীপের কাছে হামলা চালানো হয়।

সেন্টকমের দাবি, জাহাজগুলোতে হামলার আগে সেখানে থাকা ক্রুদের জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এরপর হামলা চালিয়ে জাহাজগুলো অচল করে দেওয়া হয়।

জর্ডানে ইরানের হামলার দাবি

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি খার্গ দ্বীপের কাছে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। হামলার পর একটি ট্যাংকারের ক্রুদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর জাস্কের কাছেও আরেকটি ট্যাংকারে হামলা হয়েছে বলে দাবি করে আইআরআইবি।

পরবর্তী সময়ে আইআরজিসি জানায়, মোট পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

এর জবাবে জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটিতে ‘তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা’ চালানোর দাবি করে আইআরজিসি। তাদের ভাষ্য, হামলায় মার্কিন যুদ্ধবিমান রাখার জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি হ্যাঙ্গার ধ্বংস হয়েছে।

এ ছাড়া মার্কিন নৌবাহিনীর ডিডিজি-১১৯ ও ডিডিজি-৫৩ ডেস্ট্রয়ারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি করার দাবিও করেছে আইআরজিসি। পরে আরেক বিবৃতিতে তারা জানায়, অঞ্চলটিতে থাকা দুটি মার্কিন নৌযান ও আটটি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করা হয়েছে।

তবে ইরানের এসব দাবির বিষয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

হামলার আগেই ইরানের হুঁশিয়ারি

ইরানি ট্যাংকারে মার্কিন হামলার আগে আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরে থাকা তেলবাহী জাহাজগুলোতেও হামলা চালানো হতে পারে। এসব জাহাজের ক্রুদের দ্রুত সরে যাওয়ারও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।

এর আগে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আলী আবদুল্লাহি জানিয়েছিলেন, ইরানি ট্যাংকারে হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের সরিয়ে যাওয়ার সতর্কতা দিয়েছে। এ অবস্থায় যেকোনো ইরানি ট্যাংকারে হামলা হলে ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।

এদিকে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর মধ্যে ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ধ্বংস বা প্রতিহত করা হয়েছে। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে।

জর্ডানের সামরিক বাহিনীর দাবি, হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ ও ছড়িয়ে পড়া ধাতব টুকরা যেসব এলাকায় পড়েছে, সেসব স্থান নিরাপদ করতে বিশেষায়িত দল কাজ শুরু করেছে।

‘যুদ্ধাপরাধ’ বলল ইরান

এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর তিনটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই হামলায় একটি ট্যাংকার ডুবে যায়। এর জবাবে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছিল তেহরান।

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই পরে জানিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালির বাইরে একটি নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণার পরিকল্পনা করছে তেহরান। নতুন ওই এলাকায় প্রবেশকারী যেকোনো জাহাজকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলেও সতর্ক করেছিলেন তিনি।

গতকাল ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বশেষ মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন এবং ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের এসব ‘অবৈধ ও আগ্রাসী কর্মকাণ্ড’ ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক যুদ্ধেরই অংশ। এর পরিণতির জন্য ওয়াশিংটন ও তার সহযোগীদের সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে বলেও সতর্ক করেছে ইরান।

অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হামলাগুলোর পক্ষে সাফাই দিয়েছেন। কলম্বিয়া সফরের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটবে না। তার ভাষ্য, ইরান মার্কিন নৌযানকে আঘাত করার চেষ্টা চালিয়ে গেলে প্রতিবারই তাদের আরও তেলবাহী ট্যাংকার হারাতে হবে।

সংঘাতে নতুন মাত্রা

ওয়াশিংটন থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক মাইক হান্না বলেছেন, ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতে ইরানি হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র এবার নতুন ধরনের লক্ষ্যবস্তু বেছে নেওয়ায় পরিস্থিতিতে আরও বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

তার মতে, ইরানের হামলা বা হামলার চেষ্টার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন ভিন্ন ও নতুন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছে। তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা কোনো পূর্বপরিকল্পিত কৌশলের অংশ, নাকি পরিস্থিতির কারণে নেওয়া তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত—এ মুহূর্তে তা স্পষ্ট নয়।

তবে এসব হামলা ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করার যে কৌশলের কথা যুক্তরাষ্ট্র বলে আসছে, ট্যাংকারে হামলা সেই পরিকল্পনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন হান্না।

 সূত্র: আল-জাজিরা