হুথিদের দখলে ইয়েমেনের মোখা, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই শহর?
ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী। বৃহস্পতিবার শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন হুথি আন্দোলন ও সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে।
মোখা থেকে শত শত নারী ও শিশু নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন লাহিজ ও এডেন প্রদেশে চলে গেছে। একই সঙ্গে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় তাইজ ও আল-হুদাইদাহ প্রদেশের ভয়াবহ মানবিক সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহের সংঘর্ষে এসব এলাকায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
আরও পড়ুন: আবারও মাটির নিচে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে ইরান
আল জাজিরার ইয়েমেনবিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি বলেন, সামরিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে এরই মধ্যে বেসামরিক মানুষের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, “আল-হুদাইদাহর দক্ষিণাঞ্চল ও মোখায় ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি হয়েছে। মানুষ ধুবাব ও এডেনের দিকে চলে যাচ্ছে।”
হঠাৎ সেনা প্রত্যাহার
আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০৮ ডলার, বাড়ছে সরবরাহ সংকটের শঙ্কা
মোখার পতন হুথিদের বড় ধরনের সামরিক অভিযানের ফল। এই অভিযানে ইয়েমেন সরকারের পক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আহমেদ আল-শালাফির তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে হুথিরা তিনটি দিক থেকে চাপ সৃষ্টি করে। এগুলো হলো পশ্চিম তাইজ, দক্ষিণ আল-হুদাইদাহ এবং মোখা শহর।
মোখার উপকণ্ঠে তীব্র লড়াই হয়েছে। তবে শহরটি দখলে হুথিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক কারণ ছিল ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে যাওয়া।
তাইজ থেকে ঘটনাস্থলের খবর দেওয়া আল জাজিরার প্রতিবেদক মাহা আলীও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক সালেহ। তিনি ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা। সাবেক এই প্রেসিডেন্ট প্রথম দিকে হুথিদের সঙ্গে জোট করলেও পরে হুথিদের হাতে নিহত হন।
সৌদি আরব-সমর্থিত জোট এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স বাহিনী।
আহমেদ আল-শালাফি বলেন, বৃহস্পতিবার ভোরে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স বাহিনী মোখা থেকে সরে যাওয়ার পর হুথিরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। তবে তারা নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের জন্য, সামরিক কোনো কারণে, নাকি হুথিদের ব্যাপক সামরিক চাপ মোকাবিলা করতে না পেরে সরে গেছে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
মাহা আলীর প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক সালেহ বাহিনীকে ‘কৌশলগতভাবে পিছু হটে নতুন অবস্থান নেওয়ার’ নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আল-ওয়াজিয়াহ ও মাওজা ফ্রন্টে হুথিদের অগ্রযাত্রার পর বিকল্প একটি কমান্ড সেন্টার প্রতিষ্ঠার নির্দেশও দেওয়া হয়।
নতুন নতুন এলাকায় ছড়াচ্ছে সংঘাত
ইয়েমেনের সংঘাত এখন স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রপথ ও দূরবর্তী এলাকাতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
রয়টার্স চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের হানিশ দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালাচ্ছে।
একই সময়ে মাহা আলী জানান, ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের সামরিক শাখা জানিয়েছে, সরকারি বাহিনীর বিমান আল-হুদাইদাহ প্রদেশের আল-তুহাইতা, আল-সালিফ ও কামারান দ্বীপে হুথিদের অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জুকার দ্বীপের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও সংঘর্ষ বেড়েছে। মারিবে সানা থেকে আসা হুথি বাহিনীর অতিরিক্ত সেনাদের লক্ষ্য করে এবং মারিবের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের দিকে যাওয়া বাহিনীর ওপর বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
কেন বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ মোখা
মোখার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শহরটির নিয়ন্ত্রণ শুধু ইয়েমেনের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শহরটি বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
‘গেট অব টিয়ার্স’ নামে পরিচিত এই সরু জলপথ দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সুয়েজ খালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন পণ্য এবং রাশিয়ার তেলও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
আল জাজিরার প্রতিবেদক ইউসুফ মাওরি বলেন, মোখার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের বাব আল-মান্দাবের ওপর ‘শক্ত নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিতে পারে।
এ ছাড়া মোখা দখলের মাধ্যমে হুথিদের বিরোধী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে মোখা থেকে তাইজের দিকে যাওয়া সড়ক এবং মোখা বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত সরবরাহপথ অন্যতম।
প্রতিরক্ষা নীতি বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্টাই আল জাজিরাকে বলেন, “এটি এখন যুদ্ধের একটি মোড় পরিবর্তনের ঘটনা। এর ফলে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “মোখা বন্দরই ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বশেষ বন্দর।”
মোখা দখলের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, “এই সংকটের জন্য হুথিরাই সম্পূর্ণ দায়ী।” একই সঙ্গে তিনি হুথিদের অবিলম্বে হামলা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি বন্ধ করার আহ্বান জানান।
কফির সঙ্গে মোখার ঐতিহাসিক সম্পর্ক
বর্তমানে ভূরাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলেও বহু শতাব্দী আগে মোখা ছিল আরব উপদ্বীপের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী কফি বাণিজ্যের ইতিহাসের সঙ্গেও শহরটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ‘মোখা কফি’ নামটিও এসেছে এই শহরের নাম থেকেই।
প্রাচীন হিমিয়ারাইট নথিতে শহরটির নাম ‘মাখন’ হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রিষ্টাব্দ ৫১৭ সালে আবিসিনীয়রা প্রথম শহরটি দখল করে। পরে হিমিয়ার রাজা ধু নুয়াস তাদের বিতাড়িত করেন।
১৫৩৬ থেকে ১৫৩৮ সালের মধ্যে উসমানীয় সাম্রাজ্য মোখা দখল করে নেয়। এরপর পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য শহরটিকে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
তবে কাকতালীয়ভাবে পর্তুগিজরাই প্রথম ইউরোপীয়দের মধ্যে ইয়েমেনি কফির স্বাদ গ্রহণ করে। মোখার শেখ তাদের আতিথ্য গ্রহণ করিয়ে এমন এক ‘কালো পানীয়’ পরিবেশন করেছিলেন, যা শরীরকে সতেজ ও মনকে প্রশান্ত করে বলে বর্ণনা করা হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, সুফি পণ্ডিত আলি বিন ওমর আল-শাজিলি আবিসিনিয়া থেকে মোখায় প্রথম কফি নিয়ে আসেন।
উসমানীয়রা ১৫৩৬ সালে মোখা বন্দর দিয়ে প্রথম কফি রপ্তানি শুরু করে। লোহিত সাগর হয়ে কফির বীজ সুয়েজ ও আলেকজান্দ্রিয়ায় পাঠানো হতো। সেখান থেকে তা ইউরোপীয়দের কাছে বিক্রি করা হতো।
১৬২৮ সালে ডাচরা মোখা থেকে প্রথম বাণিজ্যিক কফি চুক্তি করে। পরে তারা কফির জীবন্ত বীজ পাচার করে জাভা ও আমেরিকায় নিয়ে যায় এবং সেখানে কফি চাষ শুরু করে।
১৭ ও ১৮ শতকে মোখা বন্দর ও শহরের স্বর্ণযুগ ছিল। তবে ১৯ শতকের শেষদিকে উসমানীয় ও ব্রিটিশদের সংঘাত এবং এডেন ও আল-হুদাইদাহর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী বন্দরগুলোর দ্রুত উত্থানের কারণে মোখার গুরুত্ব কমতে শুরু করে।
এর ফলে শহরটির জনসংখ্যাতেও বড় ধস নামে। ১৯ শতকে মোখার জনসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার থাকলেও ১৯৩০-এর দশকে তা কমে মাত্র প্রায় এক হাজারে দাঁড়ায়। পরে ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ২০০৪ সালে শহরটির জনসংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
সূত্র: আল-জাজিরা





