সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ১৬০, প্রাণ গেছে বহু শিশুর

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১:৩৯ অপরাহ্ন, ২০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১:৩৯ অপরাহ্ন, ২০ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আফ্রিকার দেশ সুদানে সরকারি বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ড্রোন হামলায় প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের হামলায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ১৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে চিকিৎসাকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে।

সুদানের গৃহযুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন ইমার্জেন্সি লইয়ার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাজধানী খার্তুমে ড্রোন হামলায় তিন শিশু নিহত হয়েছে। এ ছাড়া শুক্রবার থেকে পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভিন্ন এলাকায় হামলায় ১৬০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন: জেন-জি বিক্ষোভ ঘিরে ইন্দোনেশিয়ায় সাড়ে ৯ হাজার পুলিশ মোতায়েন

এসব হামলার জন্য আরএসএফ ও সরকারি বাহিনী—উভয় পক্ষকেই দায়ী করা হচ্ছে। ২০২৩ সাল থেকে তারা যুদ্ধে লিপ্ত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ড্রোনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিও বাড়ছে।

বাজারের কাছে হামলায় নিহত ৮০

আরও পড়ুন: ইয়েমেনে সেনা প্রশিক্ষণ শিবিরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ৫৮

সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনাটি ঘটে রোববার সন্ধ্যায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় পশ্চিম কোরদোফান রাজ্যের আল-দিবাব শহরে একটি বাজারের কাছে ড্রোন হামলায় অন্তত ৮০ জন নিহত হন।

এলাকাটি আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারের দিন শেষে বাড়ি ফেরার জন্য যানবাহনের অপেক্ষায় একটি পরিবহনকেন্দ্রে জড়ো হয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। এ সময় সেখানে ড্রোন হামলা চালানো হয়।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় আহত ৪৭ জনকে কাছের আল-মুজলাদ শহরে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের মধ্যে ৩০ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বলে একটি চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে।

আরএসএফের স্বঘোষিত প্রশাসন ‘তাসিস’ এবং ইমার্জেন্সি লইয়ার্স এ হামলার জন্য সরকারি সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে।

বাঁধ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার চেষ্টা

পূর্ব সুদানের গাদারেফ রাজ্যে আতবারা ও সেতিত বাঁধ লক্ষ্য করে আরএসএফের কয়েকটি ড্রোন হামলার চেষ্টা চালায় বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক সূত্র। রোববার এসব ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছে সরকারি বাহিনী। বাঁধ দুটি রাজধানী খার্তুম থেকে প্রায় ৪২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এ বিষয়ে আরএসএফ তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

সোমবার ভোরে দক্ষিণ দারফুর রাজ্যের রাজধানী ও আরএসএফের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নিয়ালায় আরেকটি ড্রোন হামলা হয়। চিকিৎসা সূত্র ও আরএসএফের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এ ঘটনায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আরএসএফের সাত কর্মকর্তা রয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২৩ জন।

এর আগে শুক্রবার ইথিওপিয়া সীমান্তবর্তী সুদানের ব্লু নাইল প্রদেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি সমাবেশে আরএসএফের ড্রোন হামলায় ৪১ জন নিহত হন বলে জানিয়েছে ইমার্জেন্সি লইয়ার্স। সংগঠনটি এ ঘটনাকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করে হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

ড্রোন হামলার নিন্দা জাতিসংঘের

সোমবার সুদানে প্রাণঘাতী ড্রোন হামলাগুলোর নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশজুড়ে অব্যাহত প্রাণঘাতী ড্রোন হামলায় আমরা উদ্বিগ্ন। এসব হামলায় শিশুসহ বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবাব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।’

গৃহযুদ্ধে নিহত অন্তত ৫৯ হাজার

২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং আরএসএফের প্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালোর মধ্যে বিরোধের জেরে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। হেমেদতি নামে পরিচিত দাগালোর নেতৃত্বাধীন আধাসামরিক বাহিনীকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করার পরিকল্পনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল।

গত জুনে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অনুপস্থিতিতে হেমেদতিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে সংঘাত চতুর্থ বছরে গড়ালেও লড়াই থামেনি।

সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির হিসাব অনুযায়ী, সুদানের যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ত্রাণ সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে দেশটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সহায়তা সংস্থা।

চলতি বছর সুদানে ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষের জরুরি খাদ্যসহায়তা প্রয়োজন। তাঁদের মধ্যে ১ কোটি ৭৩ লাখ শিশু রয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে আনুমানিক ৮ লাখ ২৫ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে সুদানে মানবিক যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া এবং দেশটির ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। তবে চীন ও রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছে।