লো ওভারিয়ান রিজার্ভ কী? গর্ভধারণে দেরি করলে যে বিষয়টি জানা জরুরি
বর্তমানে উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবন, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যক্তিগত প্রস্তুতির কারণে অনেক নারী আগের তুলনায় দেরিতে মাতৃত্বের পরিকল্পনা করছেন। চিকিৎসকদের মতে, এটি এখন একটি সাধারণ বাস্তবতা। তবে পরিবার পরিকল্পনা পিছিয়ে দেওয়ার আগে নারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবিষয় সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন—‘লো ওভারিয়ান রিজার্ভ’।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, লো ওভারিয়ান রিজার্ভ বলতে বোঝায় বয়সের তুলনায় ডিম্বাশয়ে প্রত্যাশার চেয়ে কম ডিম্বাণু থাকা। এর অর্থ এই নয় যে একজন নারী গর্ভধারণ করতে পারবেন না; তবে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কমে যেতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রজনন চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
আরও পড়ুন: ডায়েট ও ব্যায়াম করেও ওজন কমছে না? এর পেছনে আছে যেসব শারীরিক কারণ
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি নারী জন্ম থেকেই নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। শরীরের অন্যান্য কোষের মতো নতুন ডিম্বাণু তৈরি হয় না। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকে। তবে কিছু নারীর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক সময়ের আগেই শুরু হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, লো ওভারিয়ান রিজার্ভের শুরুতে অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। তবে অনিয়মিত মাসিক, দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও গর্ভধারণে ব্যর্থ হওয়া বা বন্ধ্যাত্বের সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: গরম পানিতে লেবু খেলে কি সত্যিই ওজন কমে? জানুন সত্য ও ভুল ধারণা
এই অবস্থা নির্ণয়ে সাধারণত অ্যান্টি-মুলারিয়ান হরমোন (AMH) রক্ত পরীক্ষা এবং আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের ছোট ফলিকলের সংখ্যা (Antral Follicle Count) মূল্যায়ন করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের অবশিষ্ট ডিম্বাণুর সম্ভাব্য পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
চিকিৎসকদের মতে, বয়সই ডিম্বাণুর রিজার্ভ কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। সাধারণত ৩০ বছর বয়সের পর থেকে প্রজনন সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে এই হার আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এছাড়া জিনগত কারণ, এন্ডোমেট্রিওসিস, ডিম্বাশয়ের অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, কিছু অটোইমিউন রোগ এবং অন্যান্য চিকিৎসাজনিত কারণও ডিম্বাণুর রিজার্ভ কমিয়ে দিতে পারে।
জার্নাল অব হিউম্যান রিপ্রোডাক্টিভ সায়েন্সেস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় ৫৪ হাজারের বেশি নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৩০ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৯ শতাংশ নারীর শরীরে প্রত্যাশার তুলনায় কম AMH মাত্রা পাওয়া গেছে। ত্রিশোর্ধ্ব নারীদের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি ছিল। গবেষকদের মতে, কিছু নারীর ক্ষেত্রে ডিম্বাশয়ের বার্ধক্য আগে থেকেই শুরু হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, লো ওভারিয়ান রিজার্ভ থাকলেই মাতৃত্ব অসম্ভব—এমন ধারণা সঠিক নয়। অনেক নারী স্বাভাবিকভাবেই সন্তান ধারণ করেন, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা সহায়তা। তাই সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যাভ্যাস সরাসরি ডিম্বাণুর সংখ্যা বাড়াতে না পারলেও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সুষম খাদ্য গ্রহণ, ধূমপান পরিহার এবং স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানসিক চাপ কমাতে প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং বা মানসিক সহায়তা নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা, সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরিকল্পিত সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের পরিবার পরিকল্পনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।





