হঠাৎ উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে নানান রহস্য

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২:০৮ পূর্বাহ্ন, ২০ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৩:২১ পূর্বাহ্ন, ২০ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি’র নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যেই উগ্রপন্থী গোষ্ঠির হঠাৎ করে তৎপরতায় নানা রহস্য তৈরি হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের দেশকে স্থিতিশীল ও টেকসই উন্নয়নের পথে যাওয়ার শুরুতেই এই তৎপরতাকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র এই ছবি দেখছেন সামাজিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই তৎপরতার  মাঝে হঠাৎ করে বিগত ১৫ বছর আওয়ামী শাসনামলে বিতর্কিত জঙ্গি দমনের শীর্ষ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম youtube চ্যানেলে দেশের জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়ায় আরও সংশয় বেড়েছে। বাংলাদেশের উগ্রপন্থীদের তৎপরতা জাতিসংঘের সতর্কতা ও বিতর্কিত মনিরুল দীর্ঘ পলাতকের পর হঠাৎ করে জঙ্গি নিয়ে বক্তব্য দেওয়াকে একই চিহ্নিত গোষ্ঠীর সঙ্গবদ্ধ কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মানবাধিকার ও অন্যান্য সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগেই কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণে জঙ্গি তৎপরতা শুরুর ইঙ্গিত দেয়। এরপর বিভিন্ন স্থানে বোমা রেখে ভয় দেখানোসহ চক্রটি নানাভাবে সংগঠিত হতে শুরু করে। এরই মধ্যে এন্টি টেরিজম ইউনিট উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক তৎপরতার পুরো চক্রকেই নজরদারিতে নিয়ে এসেছে। সর্বশেষ গ্রেফতার করেছে বোমা তৈরির বিশেষজ্ঞ কারিগর ওস্তাদ জুয়েলকে। প্রধান প্রশিক্ষক বোমারু মামুনকে রাখা হয়েছে নজরদারিতে। পুলিশের বিশেষায়িত এন্টি টেরিজম ইউনিটে শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে রিমান্ডে ৩ উগ্রবাদীকে আলাদা আলাদা ও প্রয়োজনে যৌথভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। 

আরও পড়ুন: এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ, সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা

এদিকে, পুলিশের আইজিপি আলী হোসেন ফকির সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, বোমা বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধারের ঘটনা সতর্কতার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে তল্লাশি চৌকি বসানো হবে এবং নাগরিকদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ রাজধানীর ডেমরা থানা এলাকা থেকে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার ‘দাওলাতুল ইসলামের কর্মী ওস্তাদ জেল ও আরিফ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এন্টি টেরিজম ইউনিট। 

এটিইউ সূত্র জানায়, আটক সাভারের আরিফের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে গোপন তথ্যে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার উদ্দেশ্যে বিস্ফোরক দ্রব্যসহ ডেমরার সারুলিয়া এলাকায় কয়েকজন অবস্থান করছেন। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সারুলিয়ার পশ্চিম বক্সনগর নিঝুমবাগ এলাকার গরিবের নেওয়াজ মসজিদ রোডে ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডের একটি চায়ের দোকানের সামনে তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। সেখানে অভিযান চালিয়ে জুয়েল ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় আরিফ চৌধুরী পালানোর চেষ্টা করলে ৮-১০ গজ দূরে গিয়ে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়। আসামিদের কাছ থেকে কালো স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো দুটি তাজা ডেটোনেটর বোমা উদ্ধার করা হয়। বোমা দুটি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হওয়ায় ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে। 

আরও পড়ুন: কমতে পারে মোবাইল কলরেট, ফ্লোর প্রাইস কমানোর কাজ চলছে: বিটিআরসি

এ ঘটনায় এটিইউর উপপরিদর্শক (এসআই) পলাশ আলী বাদী হয়ে ডেমরা থানায় মামলাটি দায়ের করেন। বিস্ফোরণ এগুলির শক্তিশালী আলামত পাওয়া গেছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা নিজেদের ‘দাওলাতুল ইসলামের’ সক্রিয় সদস্য বলে স্বীকার করেছেন। কয়েকদিন আগে ঢাকার সাভারের সাধাপুর এলাকায় মসজিদের মাঠে একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম পড়ে থাকতে দেখে এগিয়ে যান স্থানীয় ব্যক্তিরা। ড্রামের ভেতরে ছিল স্কচটেপে মোড়ানো একটি প্রেশার কুকার। স্থানীয় লোকজন ড্রাম থেকে প্রেশার কুকারটি বের করে মাঠে রেখে পুলিশকে খবর দেন। সাভারের ভবানীপুর পুলিশ ঘটনাস্থলে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে। এ সময় প্রচণ্ড শব্দে আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধাপুরের এ ঘটনার আগের রাতে সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় তিনতলা একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ১১টি পাইপ বোমাসহ (আইইডি) বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করে। তার আগে হেমায়েতপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মোহাম্মদ আরিফ নামের এক যুবককে। তাঁর তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষিণ শ্যামপুরের ওই বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। শুধু সাভারের এই দুই ঘটনাই নয়, গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আল কুরা মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের পর অন্তত আটটি ঘটনায় নব্য জেএমবি সদস্যরা জড়িত বলে তথ্য পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। 

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, বিস্ফোরণের পর কেরানীগঞ্জের ওই মাদ্রাসা থেকে একটি মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়। ওই মুঠোফোনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১ ফেব্রুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়ায় নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হাফিজ খালিদ ইব্রাহিমের ব্যক্তিগত গাড়িচালকের বাসায় যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়। সেখান থেকে ১০টি শক্তিশালী গ্রেনেড, ৩টি বিদেশি পিস্তল, পিস্তলের ১৯টি গুলি, ১টি চাপাতি, ১টি ছুরি ও ১টি ক্ষুর উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের ওপর হামলা, কুমিল্লার একটি মন্দিরে ৭ মার্চ বোমা হামলা, ১২ মার্চ ফেনীতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা, ২৫ মার্চ যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়ে তল্লাশির সময় পাইপ বোমা বিস্ফোরণ, ২২ জুন উত্তরার দক্ষিণখানে রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের ওপর বোমা হামলা, ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতর থেকে বোমা উদ্ধার, ৩০ জুলাই আশুলিয়া এলাকার একটি মুদিদোকান থেকে প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার করা হয়। কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ, যশোরে গ্রেনেড ও অস্ত্র উদ্ধার এবং সর্বশেষ সাভারের ২টিসহ মোট ১১টি ঘটনায় উগ্রপন্থী একই গোষ্ঠী জড়িত এবং তাদের বড় নাশকতার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট  অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) কর্মকর্তারা বলেন, বড় নাশকতার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তাঁরা খবর পেয়েছেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৪ জুলাই মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতরে বোমা রাখা হয়েছিল। সাভারের জব্দ বাড়িটির ওই কক্ষ থেকে ছয়টি বোমা এবং বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামÑরাসায়নিক পদার্থ, বারুদ, গানপাউডার, ইলেকট্রিক তার, বিয়ারিং বল, নাইট্রিক অ্যাসিড, প্লাস্টিকের কনটেইনার উদ্ধার করা হয়েছে। 

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে বিস্ফোরক দ্রব্যসহ তারা সাভার এলাকায় জড়ো হয়। 

জঙ্গি দমনে নিয়োজিত আন্টি ট্যরিজম ইউনিট কর্মকর্তারা বলছে, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনার মামলায় গ্রেপ্তার শেখ আল আমিন, অলি উল্লাহ জনি; সাভারের ঘটনায় গ্রেপ্তার আরিফ, পলাতক মামুন ও বাপ্পী নামের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে। শেখ আল আমিন ২০১৭ সালে ও ২০২০ সালে দুই দফা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। 

সর্বশেষ ২০২৩ সালে আল-আমিন জামিনে বেরিয়ে আসেন। ত ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, রূপগঞ্জ ও নরসিংদী থানার মামলায় গ্রেপ্তার হন। পুলিশ কর্মকর্তা আরো জানান ২০০৪ সালের পর থেকে জেএমবিতে জড়িয়ে পড়া এমন গোষ্ঠীটি পর্যায়ক্রমে আনসার উল্লাহ বাংলা টিম, টিটিপি, দাওয়াতুল ইসলাম, নব্য জেএমবি কথিত আইএসসহ বিভিন্নউগ্রবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত হয়ে দেশে নাশকতা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। সম্প্রতি সাবেক এসবি ও সিটিটিসি প্রধান জঙ্গি নিয়ে বিতর্কিত মনিরুল ইসলামের হঠাৎ করে গণমাধ্যমে এসে নানা বক্তব্যগুলিও তারা পর্যালোচনা করছে বলে জানান।