বিদ্যুৎ গিলছে দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা
বর্তমানে শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল বেড়েছে ব্যাপক হারে। পরিবেশবান্ধব ও স্বল্প ব্যয়ের এই বাহনটি জনগণের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে—এই যানের লাগামহীন বিস্তারে চাপ বেড়েছে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা চলাচল করছে। অধিকাংশ অটোরিকশাই ট্রাফিক আইন মানে না। এছাড়া অটোরিকশাগুলো রাস্তার যে কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার চেষ্টা করে, যা সড়কে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা যায়, ৮২ শতাংশ যাত্রী যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা বেছে নেন। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, যাত্রীদের কাছে প্যাডেল রিকশার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুততর, কম ভাড়া ও সহজলভ্য মনে হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছেন ৩০ শতাংশ যাত্রী। প্যাডেল রিকশায় এ ঝুঁকির কথা বলেন ১৮ শতাংশ যাত্রী। গবেষণায় অংশ নেয়া ৬২ শতাংশ মনে করেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে শহরে যানজট বেশি হচ্ছে। ৩৪ শতাংশ যানজটের জন্য প্যাডেল রিকশাকে দায়ী করছেন। আর ৪ শতাংশ যাত্রী মনে করেন, সব রিকশাই যানজটের জন্য দায়ী।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, অটোভ্যান, লেগুনা, মিশুকসহ বিভিন্ন তিন চাকার যানের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৬ জন। স্থানীয়ভাবে তৈরি নছিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু, মাহিন্দ্রা ও টমটমের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও ৪৮৯ জন।
আরও পড়ুন: ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার আমলের ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, সাধারণত একটি ইজিবাইকের জন্য চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি প্রয়োজন। আর প্রতি সেট ব্যাটারি চার্জের জন্য গড়ে ৯০০ থেকে এক হাজার ১০০ ওয়াট হিসেবে পাঁচ থেকে ছয় ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। এতে অনায়াসে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা চালানা যায়। সে হিসেবে প্রায় ৮০ লাখ ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জের জন্য জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু ৮০ ভাগ গ্যারেজে চুরি করে ও লুকিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এসব ব্যাটারি রিচার্জ করায় সরকার দৈনিক প্রায় ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গত সোমবার সংসদে কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধিতে সংরক্ষিত মহিলা আসনের বিএনপি দলীয় সদস্য রেহানা আক্তার রানুর আনা জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের ওপর দেওয়া জবাবে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ‘নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা চলাচল প্রসঙ্গে’ শিরোনামে আনা নোটিশে সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ট্রাফিক ক্যামেরা স্থাপনের পর লালবাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘনের মতো অনিয়ম কমেছে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া চলাচল করছে। এসব যানবাহনের নম্বর প্লেট না থাকায় এআই ক্যামেরায় শনাক্ত হলেও জরিমানা করা সম্ভব হচ্ছে না।
নোটিশের ওপর দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও অনুরূপ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান নগর ও গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। কম ভাড়া, সহজলভ্যতা ও স্বল্প দূরত্বে দ্রুত যাতায়াতের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে এসব যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে দ্রুত ও অনেকাংশে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে এ খাত এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিপুলসংখ্যক যান একসঙ্গে চার্জ দেওয়ায় স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। অনুমোদিত বা আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগের বাণিজ্যিক ব্যবহার, ট্রান্সফরমার ও বিতরণ লাইনে বাড়তি লোড এবং পিক সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির মতো সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। নোটিশে রেহানা আক্তার রানু বলেন, অটোরিকশা তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ বাহনে পরিণত হয়েছে। ফলে, একদিকে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব যানবাহনের কাঠামোগত ত্রুটি দূর করা প্রয়োজন, অন্যদিকে প্রধান সড়কে বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। তিনি অটোরিকশায় নম্বর প্লেট সংযোজন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের আওতায় আনা এবং প্রধান সড়ক থেকে এসব যান সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন। নোটিশের ওপর দেওয়া বক্তব্যে সংরক্ষিত আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, বর্তমানে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচলের পাশাপাশি ঢাকায় প্রতিদিন আরো প্রায় ৩০০টি অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে। তার দাবি—প্রতিদিন অটোরিকশার চার্জিং খাতে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, যা বর্তমানে লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে চার্জিং করায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না। তবে, অটোরিকশার সঙ্গে বিপুল মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত উল্লেখ করে তিনি বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়া এসব যানবাহন জব্দ, ডাম্পিং বা চালকদের হয়রানি না করারও আহ্বান জানান। রানুর নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল শুধু যানজট নয়, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। মন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় যুক্ত যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অংশ ছিল ১৩.৫৪ শতাংশ। মন্ত্রী জানান, অনিবন্ধিত যান, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, ব্রেক ও আলো ব্যবস্থার ত্রুটি, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট রুট, স্ট্যান্ড, পার্কিং ও যানসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ঢাকায় এসব যান যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করছে। অটোরিকশায় ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের কারণে সিসাদূষণ, মাটি ও পানিদূষণ বাড়ছে। এতে বিশেষ করে শিশু শ্রমিকদের গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কৃষি ও পোল্ট্রি শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: দেশে ফের বেড়েছে লোডশেডিং, ভ্যাপসা গরমে চরম অস্বস্তিতে মানুষ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা চালু রয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে আরো ২০০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়েও এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। অটোরিকশাকে একটি সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে অনুমোদিত অটোরিকশাকে নম্বর প্লেট ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে। চালকদের নিবন্ধনের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে। নির্ধারণ করা হবে চলাচলের সড়ক। যানবাহনের সংখ্যা, রুট, চালক এবং চলাচল ব্যবস্থাপনাও নিয়ন্ত্রণ করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, অটোরিকশা ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় প্রতিটি অটোরিকশাকে ডিজিটাল নিবন্ধনের মাধ্যমে কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ফলে একটি নম্বরের অধীনে অবৈধভাবে একাধিক অটোরিকশা পরিচালনার সুযোগ থাকবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত নীতিমালায় অটোরিকশা চালকদের কর্মসংস্থান যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এসব যানকে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। তিনি জানান, অটোরিকশায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি বাদ দিয়ে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের ওপরও নীতিমালায় কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান গ্রামীণ ও নগর পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি চালক, গ্যারেজ শ্রমিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী ও চার্জিং সেবাদাতাসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তবে এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, অটোরিকশার সঙ্গে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই তাদের বিকল্পব্যবস্থা না করে বাহন জব্দ, ডাম্পিং বা পুলিশি হয়রানি করা ঠিক হবে না। বরং প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের সুযোগ দিতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং নীতিমালা ও বিধি প্রণয়নের অগ্রগতি হয়েছে। কর্মসংস্থান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, পরিবেশ রক্ষা হয়, যানবাহনের শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়—সবদিক বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বেকারত্ব না বাড়িয়ে, কর্মসংস্থান ব্যাহত না করে পরিবেশ রক্ষা এবং যানবাহনের সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতারাতি এই বাহন পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনই সমীচীনও হবে না। কারণ, এর সঙ্গে প্রায় ৮০ লাখ মানুষের রুটি-রুজি জড়িত। প্রতিদিন সড়ক থেকে কয়েকটি রিকশা জব্দ করে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মিলবে না। বরং অবৈধ যন্ত্রাংশ আমদানিকারক, রিকশার বডি প্রস্তুতকারক এবং বিদ্যুৎ চুরির সিন্ডিকেটের ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।





