জ্বালানি তেলের রেকর্ড, মূল্যবৃদ্ধি ক্ষোভে ফুঁসছে মানুষ

Shahrier Islam Pallab
শামসুজ্জামান শামস
প্রকাশিত: ৮:১৩ পূর্বাহ্ন, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৯:৫৯ অপরাহ্ন, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে আবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম। কোনো ধরনের পূর্বালোচনা ছাড়াই ভর্তুকির চাপ কমাতে একলাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার, যার জেরে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের সামাজিক সুরক্ষা খাতের অন্যান্য জরুরি বরাদ্দ সচল রাখতেই এই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে হঠাৎ এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আরও বাড়ার শঙ্কায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দেশের সাধারণ ভোক্তারা।

গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এই নতুন দাম ইতোমধ্যে দেশব্যাপী কার্যকর করা হয়েছে। তবে হঠাৎ করে তেলের দাম এতটা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ, পরিবহন চালক এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা কমবে এবং প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি পাচার হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পাবে। যদিও জনগণের ক্ষোভ ও অর্থনৈতিক প্রভাব হঠাৎ করে তেলের দাম একলাফে এত টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ভোক্তা ও  বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বাস, ট্রাক ও সিএনজি ভাড়াসহ সব ধরনের যাতায়াত খরচ তাৎক্ষণিকভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর রাজধানীর বিভিন্ন গণপরিবহনে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে বাড়তি ভাড়া নিয়ে তর্কাতর্কি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে বাজারে শাকসবজি ও চালডালসহ নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, সেচ কাজের জন্য ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষকদের খরচ বাড়বে এবং কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশের রপ্তানি খাতও চাপের মুখে পড়বে।

আরও পড়ুন: ৮১তম উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর যোগদান

জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে দক্ষিণাঞ্চলের বাস ভাড়া বাড়ল:

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর ঢাকাখুলনাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসে যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাস মালিকরা।  গতকাল সোমবার সকালে সংশ্লিষ্ট রুটের বাস মালিকরা বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত নেন বলে বাস মালিকদের সূত্রে জানা গেছে। মালিকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা থেকে খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী গণপরিবহনে আগের ভাড়ার সঙ্গে যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা যোগ করার কথা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) নতুন ভাড়া নির্ধারণ না করা পর্যন্ত এই বাড়তি ভাড়া আদায় করা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন স্থানে বাড়তি ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে যাত্রীদের সঙ্গে বাস শ্রমিকদের বিরোধের আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি তেলের বর্ধিত দাম প্রত্যাহারের দাবি যাত্রী সমিতির : আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার সময়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির দাবি, বর্ধিত দাম বহাল থাকলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। গতকাল সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি  জানান সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ববাজারে বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী। অন্যদিকে দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন কলকারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জনজীবনে আরও চাপ তৈরি করবে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। সংগঠনটির ভাষ্য, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সাত মাসের মধ্যে দুই দফা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করেছে। এর ফলে যাতায়াত, যোগাযোগ, পণ্য ও যাত্রী পরিবহনসহ শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে। এতে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্যও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিবৃতিতে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য জরুরি ভিত্তিতে প্রত্যাহার করে আগের দাম বহাল রাখার দাবি জানানো হয়। সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকার জনস্বার্থে কোনো কোনো খাতে ব্যবসা করবে এবং কোথাও ভর্ত ুকি দেবে, এটাই বাস্তবতা। দেশের চরম আর্থিক সংকটের সময়ে জ্বালানি খাতে ভর্ত ুকি দিয়ে অর্থনীতি সচল রাখা এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর মাধ্যমে সংকটাপন্ন মানুষের পাশে থাকা সরকারের দায়িত্ব।

আরও পড়ুন: সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী শাহজালাল বিমানবন্দরের ক্যানোপি-২ এলাকার ঘটনার সত্যতা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো অপরিণামদর্শী:

জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অপরিণামদর্শী ও সুবিবেচনাপ্রসূত নয় বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। গতকাল দুপুরে এক ভিডিও বার্তায় তিনি এ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, হঠাৎ করে গত রবিবার রাত ১০টার দিকে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এ ঘোষণার পর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কারণ জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার প্রায় সব বিষয়ই আন্তঃসম্পর্কিত। নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শিল্প-কলকারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাসাবাড়িসহ সব জায়গাতেই খরচ বাড়বে। গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়বে। এসব খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত বাড়তি টাকাটা ভোক্তার পকেট থেকেই যাবে। এতে মানুষের খরচের পাল্লা ভারী হবে। একইসঙ্গে অন্যান্য পণ্য ও সেবার সঙ্গে জ্বালানি তেলের সম্পর্ক থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও আরেক দফা বাড়তে পারে। তিনি বলেন, ইতঃপূর্বে ব্যবসায়ীরা ইরান-সংকটসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। বাধ্য হয়ে তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার। গতকাল সোমবার জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। একইসঙ্গে দাম বাড়ানোর কারণে জনগণের যে কষ্ট হবে, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে অব্যাহতভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আমাদের সামনে আবির্ভ ূত হচ্ছে। এর ফলে বিমার প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া বাড়ছে। এ অবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের পক্ষে এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনও বিকল্প ছিল না। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা বারবারই বলেছিলাম যে, উপায়হীন না হলে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তটি সরকার নিতে চাইবে না, কিংবা নেবে না। তিনি বলেন, এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। জনগণের জীবনমানের কষ্ট লাঘবের অভিপ্রায়ে রাজনীতিতে এসেছি। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে জনগণের যে কষ্ট হবে, এটি আমি উপলব্ধি করি। সেই কারণে জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। তিনি আরও বলেন, চলমান সংকট দ্রুত কেটে যাবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবারও সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

চার ধরনের জ্বালানি তেলে লিটারে বাড়ল ২০ টাকা:

চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত রবিবার রাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গতকাল সোমবার থেকে এ দর কার্যকর হবে। সবশেষ জুনে তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। ডিজেল ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন ১৩০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা থেকে ১৪৫ টাকা করা হয়। এরপর জুলাই, অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরেও সেই দাম বহাল ছিল। গেল এপ্রিলের পর সরকার আবার এক লাফে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এত বেশি বাড়াল। কেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হল? সেই ব্যাখ্যা দিয়ে একই দিন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় বলছে, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও সরকার দেশে সেই হারে দাম বাড়ায়নি বলে বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী শুধু ডিজেলেই বিপিসির লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে দাবি করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দৈনিক এ লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। এ হারে এক বছরে শুধু ডিজেলেই প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হবে বলেছে মন্ত্রণালয়। লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে সরকার মনে করছে। দাম বাড়ানোর আরেকটি কারণ হিসেবে অন্য দেশের সঙ্গে দামের ব্যবধান তুলে ধরা হয়। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাবে, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ভারতের কলকাতায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা। থাইল্যান্ডে এ দাম ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা ৭১ পয়সা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা। বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় অন্য দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এলএনজি খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ব্যয়ের কথাও দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে সরকার। সেখানে ডিজেলের কর-উত্তর এক্স-রিফাইনারি বা শোধনাগার থেকে খালাস হওয়া মূল্য লিটারপ্রতি ১২৩ টাকা ৫৮ পয়সা ধরা হয়েছে। কেরোসিনে তা ১৪৩ টাকা ৭৮ পয়সা, অকটেনে ১৪৯ টাকা ৭৮ পয়সা এবং পেট্রোলে ১৪৪ টাকা ৯৯ পয়সা। এর সঙ্গে ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট, শুল্ক, তেল বিপণন কোম্পানির মার্জিন (লাভ), সমান পরিবহন ভাড়া তহবিল ও বিপিসির উন্নয়ন তহবিলের অর্থ যোগ করা হয়েছে। এসব যোগ করে মূল স্থাপনা কেন্দ্র মূল্য দাঁড়িয়েছে ডিজেলে ১৩০ টাকা ১৩ পয়সা, কেরোসিনে ১৫০ টাকা ৮২ পয়সা, অকটেনে ১৫৭ টাকা ১২ পয়সা এবং পেট্রোলে ১৫২ টাকা ২৩ পয়সা। ডিপো থেকে ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে ডিলারের স্থানীয় পরিবহন খরচ রাখা হয়েছে সব ধরনের তেলে লিটারপ্রতি ১ টাকা ১৬ পয়সা। ডিলার ও এজেন্ট কমিশন রাখা হয়েছে ডিজেলে ৩ টাকা ৭১ পয়সা, কেরোসিনে ৩ টাকা ২ পয়সা, অকটেনে ৬ টাকা ৭২ পয়সা এবং পেট্রোলে ৬ টাকা ৬১ পয়সা। এসব যোগ করে ভোক্তা পর্যায়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিপো থেকে ৪০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ট্যাংকলরিতে জ্বালানি তেল পরিবহনের ভাড়া ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। ইরান যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকটের সময় গেল ১৮ এপ্রিল চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাখে অনেকখানি বাড়ায় সরকার। তখন ডিজেল ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়। মার্চে ডিজেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা। গতকাল সোমবার থেকে নতুন দাম কার্যকর হওয়ায় মার্চের তুলনায় ডিজেলের দাম লিটারে ৩৫ টাকা, অকটেন ৪৫ টাকা, পেট্রোল ৪৪ টাকা এবং কেরোসিন ৪৩ টাকা বেশি হবে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু হয়। এ পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, আমদানি ব্যয়, শুল্ক-কর, ডলারের বিনিময় হার, বিপিসির মার্জিন, ভ্যাট ও বিতরণ ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।

জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি সরকারের গণবিরোধী নীতির বহিঃপ্রকাশ:

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। গতকাল সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বর্তমান সরকার ৫ মাসে ৩ বার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালো। যা সরকারের গণবিরোধী নীতির বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য এক লাফে লিটার প্রতি ২০ টাকার বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করতে হবে। তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ যখন মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপে নাভিশ্বাস উঠছে, তখন বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করে দাম বৃদ্ধি ও জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে সরকারের তথাকথিত লোকসান কমানোর এই নীতি সরাসরি আমজনতার পকেট কাটার শামিল। চাল, ডাল, সবজিসহ প্রতিটি মৌলিক পণ্যের দামের ওপর এই জ্বালানি মূল্যের যে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ প্রভাব পড়তে যাচ্ছে, তা সাধারণ শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের মুখের আহার কেড়ে নেবে। বাসদ সাধারণ সম্পাদক বলেন, বর্তমান সরকার ৫ মাসে ৩ বার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালো। যা সরকারের গণবিরোধী নীতির প্রকাশ। তিনি অবিলম্বে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার, গ্যাস, বিদ্যুত, পানির সংকট নিরসন ও দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখার দাবি জানান। জামায়াত ও এনসিপির বিক্ষোভ মিছিল: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গতকাল বিকেল পৌনে ৫টায় মহাখালী রেলগেটের সামনে থেকে এ বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের। এছাড়া ও কেন্দ্রীয় ও মহানগরী নেতারাও বক্তব্য রাখেন। অপরদিকে জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার আয়োজনে কর্মসূচিতে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রতি লিটার ডিজেলে ৯০ টাকা লোকসানে বিপিসি :

প্রতি লিটার ডিজেলে  বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রায় ৯০ টাকা লোকসান করছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম সমন্বয় করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। গতকাল সোমবার গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান বিপিসি চেয়ারম্যান। এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। গত রবিবার রাতে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। নতুন দাম সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। একইভাবে কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে চলতি বছরের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থ বিবেচনায় দেশে তা পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।