চীন-বাংলাদেশ নতুন যুগের কৌশলগত মেলন্ধন

Shahrier Islam Pallab
শামসুজ্জামান শামস
প্রকাশিত: ১২:১১ অপরাহ্ন, ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১২:১১ অপরাহ্ন, ০৬ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বর্তমানে কৌশলগত অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এক ঐতিহাসিক উচ্চতায় অবস্থান করছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার। বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য এবং বাংলাদেশে শত শত চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ স্থানীয় কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ যেন চীনে বেশি পণ্য রপ্তানি করতে পারে, সেজন্য বেইজিং বিভিন্ন ধাপে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার প্রদান করেছে, যা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেলসহ মেগা প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিপ্লব ঘটিয়েছে।

চীনের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১ অক্টোবর পাঠানো এক শুভেচ্ছাবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে এবং নিজের পক্ষ থেকে চীনের প্রেসিডেন্টকে উষ্ণ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব আরও বিকশিত হয়েছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিধি ও গভীরতা ক্রমাগত বাড়ছে, যা দুই দেশের জনগণকে আরও কাছাকাছি এনেছে এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন: এক কর্মকর্তার হাতে পাঁচ পদ, নিয়োগ ও দায়িত্ব নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্বলিত বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি গড়ে তোলার যৌথ অঙ্গীকার দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই অভিন্ন লক্ষ্য দুই দেশের বন্ধুত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করবে এবং পারস্পরিক কল্যাণে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। শুভেচ্ছাবার্তায় চীনের প্রেসিডেন্টের সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে চীনের জনগণের অব্যাহত শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাফল্য কামনা করেন তিনি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে চীন দীর্ঘকাল ধরে প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য চীনের তৈরি যুদ্ধবিমান জে-১০সি কেনার পথে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। ২৫ আগস্ট সচিবালয়ে সরকারের সমসাময়িক কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।

আরও পড়ুন: তদবির ঠেকাতে লটারিতে ঢাকার ৭ ভূমি অফিসে ৯ জনের বদলি

উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মডেলের চতুর্থ প্রজন্মের এমআরসিএ ফাইটার এয়ারক্রাফট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার ও ইউএভি সিস্টেম—এগুলো কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল প্রথাগত বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি গভীর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সম্পর্কের পূর্ণ সুফল পেতে বাংলাদেশ পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে সামনের দিকে এগোচ্ছে।

১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ৫১ বছরে দুই দেশ পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহযোগিতা ও আস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের রূপ বদলেছে, কিন্তু এর মূল ভিত্তি পারস্পরিক সম্মান ও অভিন্ন উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা এখনও অটুট রয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম দিকের বছরগুলোয় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কিছু রাজনৈতিক জটিলতা ছিল। বিশেষ করে কোল্ড ওয়ারের সময়কার বৈশ্বিক মেরুকরণের কারণে। কিন্তু দেশ স্বাধীনের চার বছর পর উভয় দেশ দ্রুতই বাস্তবমুখী কূটনীতির পথে অগ্রসর হয়। ধীরে ধীরে বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও অবকাঠামো উন্নয়নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নতুন মাত্রার বন্ধুত্ব। আজ ৫১ বছর পর চীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদার।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে বাংলাদেশের নীতিতে ভারতের দিকে যে বিশেষ পক্ষপাত বা একচেটিয়া নির্ভরতার অভিযোগ ছিল, নতুন সরকার তা থেকে বের হয়ে এসে পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বিস্তৃত করছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম সফরে প্রথাগতভাবে ভারতে না গিয়ে চীন সফরে যাওয়ায় আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের অনেকেই একে ঢাকার কৌশলগত অগ্রাধিকার পরিবর্তনের সংকেত হিসেবে দেখছেন। নতুন সরকার অন্ধভাবে কোনো ব্লকের দিকে ঝুঁকছে না, বরং চীনের বিশাল অর্থনৈতিক ও কারিগরি সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে চাইছে, যা একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অংশ।

শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সামরিক খাতে চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২৬ সালে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই তিন সংবেদনশীল খাতে দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সহযোগিতা আরও বেগবান হয়েছে।

গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন ধাপে উন্নীত করার ঘোষণা এসেছে। দুই দেশের জনগণের ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ গড়ার স্বার্থে অংশীদারত্বের পাশাপাশি আলোচিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর উন্নয়নে আগ্রহ দেখিয়েছে বেইজিং। চীন সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আলোচনায় সি চিন পিং বলেছেন, বিশ্বে যেকোনো পরিবর্তনই আসুক না কেন, চীন বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু’, ‘সুপ্রতিবেশী’ আর ‘ভালো অংশীদার’ হিসেবেই থাকবে। দুই শীর্ষনেতা প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি একান্তেও কথা বলেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে ১৪ দফার যৌথ ইশতেহার প্রচার করা হয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চীন সব সময় বেইজিং-ঢাকা সম্পর্কের উন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ নীতিতে অটল রয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি চীনের সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানান চীনের প্রেসিডেন্ট।

সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পর্ক জোরদার, কৌশলগত যোগাযোগ গভীর, রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং দুই দেশের নিজ নিজ মৌলিক স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়গুলোতে একে অপরকে সমর্থন অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত বলে উল্লেখ করেন সি চিন পিং।

চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে শাসন কার্যক্রম পরিচালনায় সমর্থন করে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে উচ্চমানের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগে (বিআরআই) সহযোগিতা এগিয়ে নিতে প্রস্তুত। বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগ আরও জোরদারের লক্ষ্যে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

বাংলাদেশ স্বীকার করে যে তাইওয়ান চীনের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেকোনো ধরনের ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবের কর্তৃত্ব দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। চীনকে বাংলাদেশের এক মূল্যবান ও বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, চীন একটি মহান দেশ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে যার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। নতুন যুগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে উন্নীত হওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের শক্তিশালী নেতৃত্বে চীন উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন অর্জন করেছে এবং চীনের আধুনিকায়ন থেকে বাংলাদেশের শেখার রয়েছে।

আধুনিকায়নের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় পরিসরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ জোরদার, অঞ্চল ও পথের উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া এবং অর্থনীতি ও বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা ও বিনিময় বাড়ানোর প্রত্যাশা করে।

বাংলাদেশ এক চীন নীতির প্রতি দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ স্বীকার করে যে তাইওয়ান চীনের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেকোনো ধরনের ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবের কর্তৃত্ব দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।

জনগণের অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন সম্প্রদায় গড়ে তোলার ধারণা এবং প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের উত্থাপিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ বিশ্বশান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

যোগাযোগ ও অর্থনীতির ‘ব্যাপ্তি বাড়াতে’ বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব আবারও সামনে এনেছে বেইজিং। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে কাজ করারও আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সাংবাদিকদের জানান, গ্রেট হল অব দ্য পিপলসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে এই প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

বৈঠকের পর বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, সেখানে প্রস্তাব এসেছে, কীভাবে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর তৈরি করা যায়, যার মূল উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো, অর্থনৈতিক বিনিময় বাড়ানো এবং বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা।

প্রসঙ্গত, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের ধারণাটি নতুন নয়। এটি চীনের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ বা বিআরআইয়ের আওতাধীন একটি প্রস্তাবিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ রুট। এই করিডরের মূল লক্ষ্য হলো চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক ও কাঠামোগত সংযোগ স্থাপন।

প্রস্তাবিত ওই করিডর চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় পৌঁছাবে। সেখান থেকে একটি অংশ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন এবং অন্য একটি অংশ রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই সংযোগটি পরে সড়ক ও রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব চীনের।

গত শতকের নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা বিসিআইএম নামে পরিচিতি পায়। ২০১৩ সালের দিকে উদ্যোগটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। এ নিয়ে নানা স্তরের বৈঠকও হয়েছিল, কিন্তু চীনের বিআরআই নিয়ে ভারতের ভূরাজনৈতিক আপত্তি ও অনীহার কারণে বিসিআইএম নামের অর্থনৈতিক করিডরের উদ্যোগটি আর এগোয়নি।

এরপর ভারতকে বাদ দিয়ে চীন তাদের বিদ্যমান ‘চীন-মিয়ানমার’ ইকোনমিক করিডর সম্প্রসারিত করে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়। এমনকি বিসিআইএম যখন এগোচ্ছিল না, তখন থেকেই ভারতকে বাদ দিয়ে চীন ত্রিদেশীয় উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আলোচনার টেবিলে আনে।

প্রস্তাবিত ওই করিডর চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় পৌঁছাবে। সেখান থেকে একটি অংশ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন এবং অন্য একটি অংশ রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই সংযোগটি পরে সড়ক ও রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব চীনের। বলা হচ্ছে, এই করিডর হলে বাংলাদেশের সড়ক, রেলওয়ে, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ আসার সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে।

চীন চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে—জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ‘এই বন্দরের আধুনিকায়ন করে কীভাবে এটাকে আমরা একটা আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, যেটা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, অন্যান্য দেশের জন্যও সেবা নিশ্চিত করবে, সেটা নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরকে উন্নীত করার জন্য এবং মোংলা বন্দরকে আরও বেশি আধুনিকায়ন করতে চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে।’

মাহদী আমিন জানান, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কীভাবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োগ করা যায়, সে বিষয়ে চীন সহায়তা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বিদেশে চিকিৎসা করতে যান। ভিসাপ্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে এবং অন্যান্য সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের জন্য দ্বার উন্মোচন করতেও আগ্রহী চীন।

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। ১ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠার ৭৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগের কারণে সম্পর্ক এ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে সমর্থন করে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় পাশে থাকবে। রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, এ বছর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫১তম এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতার ১০ম বার্ষিকী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তিনি অভিহিত করেন। বাংলাদেশে তিন বছর নয় মাস দায়িত্ব পালনের পর তিনি দায়িত্ব ছাড়ছেন। এই সময়কে নিজের কূটনৈতিক জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশের তরুণদের আশাবাদ ও দৃঢ়তার প্রশংসা করে তিনি বলেন, তারুণ্যই দেশের ভবিষ্যৎ। তিনি আরও বলেন, চীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে চলছে এবং চলতি বছরের প্রথমার্ধে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে ইয়াও ওয়েন বলেন, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার পথ আরও বিস্তৃত হবে।

চীন শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নেরও অংশীদার। প্রতিবছর শত শত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী চীনে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, চিকিৎসা ও ব্যবসা প্রশাসন—বিভিন্ন বিষয়ে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের অন্যতম গন্তব্য।

এ ছাড়া হুয়াওয়ে, শাওমি, অপো, ভিভোসহ চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্প বাস্তবায়নে চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তা একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। অর্থনীতি ও রাজনীতির বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সাংস্কৃতিক সংযোগ। দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ছে। চীনা ভাষা শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, চলচ্চিত্র উৎসব, পর্যটন—সব ক্ষেত্রেই পারস্পরিক আগ্রহ বাড়ছে। ঢাকায় কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট চীনা সংস্কৃতি ও ভাষা প্রচারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। অপরদিকে চীনে ‘বাংলাদেশ কালচারাল উইক’ আয়োজন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।

অর্ধশতাব্দীর এই বন্ধুত্ব এখন এক নতুন উচ্চতায় দাঁড়িয়ে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা—এই তিন বাস্তবতা দুই দেশকেই নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশের লক্ষ্য এখন উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর। আর চীন চায় বিশ্ব বাণিজ্য ও প্রযুক্তিব্যবস্থায় নিজের প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে। এই দুই আকাঙ্ক্ষা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, যদি সম্পর্কটি কেবল সরকারি নয়, বেসরকারি খাত ও জনগণের মধ্যেও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫১ বছরের এই যাত্রা নিঃসন্দেহে গর্বের। এটি দুই জাতির পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহযোগিতার এক জীবন্ত ইতিহাস। এই ৫১ বছরে সম্পর্ক বহু পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেছে। বিশ্বরাজনীতির পালাবদল, অর্থনৈতিক বাস্তবতার রূপান্তর এবং আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার নতুন সমীকরণ—সবকিছুই এ সম্পর্ককে পরীক্ষিত করেছে, আবার দৃঢ়ও করেছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সম্পর্কটিকে শুধু উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরস্পরের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দেওয়া সময়ের দাবি।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, এ সম্পর্ক যেন অর্থনৈতিক লাভের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাংস্কৃতিক বিনিময়, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার এক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। অর্ধশতাব্দীর এই যাত্রা আমাদের শিখিয়েছে, সত্যিকারের বন্ধুত্ব কেবল কূটনৈতিক বিবৃতিতে নয়, মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনায় নিহিত।

বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতেও চীনের সম্পৃক্ততা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, মোবাইল নেটওয়ার্ক, টেলিকম যন্ত্রাংশ, স্মার্টফোন অ্যাসেম্বলি এবং সোলার পাওয়ার প্রযুক্তিতে চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হুয়াওয়ে, শাওমি, অপ্পো, ট্রানশিয়ন ও জেডটিইর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে সরাসরি উৎপাদন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। তথ্যপ্রযুক্তি পার্কগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে চীনা সংস্থাগুলো নতুন স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না, তবে এই বিনিয়োগ যেন প্রকৃত শিল্পায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের উচিত বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক কেবল বিনিয়োগ বা অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি প্রযুক্তি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে।