কওমিপন্থী মাদ্রাসা গুলোতে হঠাৎ নানা অপকর্ম, কঠোর হচ্ছে সরকার

Shahrier Islam Pallab
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৭:২৪ অপরাহ্ন, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৭:২৮ অপরাহ্ন, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের বিভিন্ন এলাকার কওমি ও আবাসিক মাদ্রাসায় একের পর এক ছাত্র ও শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের  সর্বস্তরে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার সৃষ্টি হয়েছে। ‘মাদ্রাসায় বলাৎকার’ ঘটনায় দেশজুড়ে তুলপাল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বস্তরে সমালোচনার ঝড় ওঠেছে। এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন অভিভাবক ও সমাজ বিশ্লেষকরা। তবে এ ধরনের অশালীন ঘটনাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে, ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি রোধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। একইভাবে সমাজকর্মী-আলেম সমাজ এবং সাধারণ নাগরিকরা একযোগে দাবি তুলছেন যে, ধর্মীয় ও পবিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে প্রতিটি মাদ্রাসায় জবাবদিহিতা ও কঠোর আইনি নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে, মাদ্রাসায় শিশু ও শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নিপীড়ন বা বলাৎকারের ঘটনা এবং তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও জনমনে তীব্র সমালোচনার ঝড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও সামাজিক সচেতনতার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারের দাবি জানাচ্ছেন সাধারণ নাগরিক ও মানবাধিকার কর্মীরা। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এই ধরনের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই জড়িতদের গ্রেপ্তার করছে এবং মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটিকে আরও জবাবদিহিতার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেসসচিবের নামে প্রতারণা, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার

জানা গেছে, গত ২১ অক্টোবর সকালে সাতক্ষীরার আশাশুনিতে বোর্ডিংয়ের চাল-ডাল রান্নাঘরে পৌঁছে দেওয়ার পথে ১৪ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ওই শিক্ষক ছাত্রকে কক্ষে ডেকে টেপাতেন হাত-পা এবং করতেন যৌন নিপীড়ন। এরইমধ্যে হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পরানদহা এলাকা থেকে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া মো. মোখলেছুর রহমান (৪০) সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ী ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামের বাসিন্দা। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার আশাশুনি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই শিক্ষার্থী মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের আবাসিক ছাত্র হিসেবে বোর্ডিংয়ে থাকত। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসতেন এবং রাজি না হলে মারধর ও নানাভাবে হয়রানি করতেন। এমনকি কয়েক দিন ধরে গভীর রাতে শিক্ষক নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে ওই শিক্ষার্থীকে দিয়ে হাত-পা টেপাতেন। ওই শিক্ষার্থীকে প্রধান শিক্ষক নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন। সে সময় ভুক্তভোগী চিৎকার করতে চাইলে শিক্ষক তার মুখ চেপে ধরে ঘটনাটি কাউকে জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরে বাড়িতে ফিরে শিক্ষার্থী তার বাবা-মাকে পুরো বিষয়টি খুলে বলে। অসুস্থ বোধ করায় পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘের সংস্কার সমর্থন করে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

গাজীপুর মহানগরীর গাছা এলাকায় একটি আবাসিক কওমি মাদরাসার আট বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মামলার আসামিরা হলেন-মো. অলিউল্লাহ ইসলাম (২৩), মোহাম্মদ মিজান (৩৮) ও মো. আব্দুল কুদ্দুস শেখ (৪৫)। অলিউল্লাহ ইসলাম মাদরাসাটির শিক্ষক বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহার সূত্রে জানা যায়, শিশুটি মাদরাসাটির আবাসিক বিভাগে থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করত। শিশুটির মায়ের অভিযোগ, ৭ অক্টোবর বিকেল ৪টার দিকে তিনি ছেলেকে মাদরাসার আবাসিক বিভাগে রেখে যান। ১৩ অক্টোবর দুপুরে ছেলে বাসায় খেতে এলে গোসল করানোর সময় শরীরের একটি অংশে প্রচণ্ড ব্যথার কথা জানায়। ব্যথার কারণ জানতে চাইলে শিশুটি শিক্ষকের যৌন নিপীড়নের কথা জানায়। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনা কাউকে জানালে তাকে মারধর করা হবে বলে ভয় দেখানো হয়েছিল। বিষয়টি জানার পর শিশুর মা মাদরাসায় গিয়ে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে কৌশলে মাদরাসা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলেও উল্লেখ করা হয়। এজাহারে আরও দাবি করা হয়েছে, শিশুটির মায়ের পরিচিত এক নারীর ১০ বছর বয়সী ছেলেও একই মাদরাসায় পড়াশোনা করত। ওই শিশুও অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছে। পরে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানতে পারেন তারা। তবে গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রব্বানী বলেন, এ ঘটনায় তিনজনের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা হয়েছে। দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

গত ২২ অক্টোবর পাবনা সদরের ভাঁড়ারা ইউনিয়নে মধ্যরাতে মাদ্রাসার এক ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এঘটনায় তৎক্ষণাৎ অভিযুক্ত ওই শিক্ষককে আটক করেন এলাকাবাসী। পরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ইউনিয়নের দড়িভাউডাঙ্গার পদ্মা হাসপাতালের পাশে নুরানী মাদ্রাসায় এঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম আবু ইউসুফ প্রামানিক। তিনি ওই মাদ্রাসার পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি পার্শ্ববর্তী সাদুল্লাহপুর ইউনিয়নের খালিশপুরের বাসিন্দা।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘ ৫ বছরের বেশি সময় ধরে ভাঁড়ারার দড়িভাউডাঙ্গা এলাকায় ওই মাদ্রাসা পরিচালনা করছিলেন ইউসুফ প্রামানিক। মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের আবাসিক ব্যবস্থা থাকায় স্ত্রীকে নিয়ে তিনিও মাদ্রাসায় থাকতেন। বৃহস্পতিবার তার স্ত্রী বাসায় যাওয়ায় ওইদিন রাতে তিনি একাই ছিলেন। মাদ্রাসার নাজেরা বিভাগের এক ছাত্রী রাতে বাইরে বের হলে তাকে রুমে টেনে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। তবে মেয়েটি দৌড়ে মাদ্রাসা থেকে বের হবার পর স্থানীয়দের মধ্যে জানাজানি হয়। পরে ওই রাতেই স্থানীয়রা মাদ্রাসায় জড়ো হয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে পুলিশে খবর দেন। এসময় মাদ্রাসায় থাকা শিক্ষার্থীদের রাতেই অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়। এদিকে পুলিশ অভিযুক্তকে আটক করে আনার পর ওই মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। গত ১৭ জুন ঢাকার সাভারে ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগে এক মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম গোলাম রব্বানী (৪০)। তিনি সাভারের তেঁতুলঝোড়া এলাকার একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ।

পুলিশ পরিদর্শক নূর মোহাম্মদ বলেন, একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগ এনে গতকাল রাতে মামলা দায়ের করেন ১৫ বছর বয়সী ওই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর বাবা। ২১ মে রাজধানীর রামপুরায় বলাৎকার ও আত্মহত্যায় প্ররোচণার চাঞ্চল্যকর মামলার আসামি মো. শিহাব হোসেন (১৯)-কে গ্রেপ্তার করে রামপুরা থানা পুলিশ। গত ১৯ মে রাতে রামপুরা থানার বনশ্রী সি-ব্লকে অবস্থিত আলোকিত কুরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদরাসায় মো. আব্দুল্লাহ (১০) নামে এক শিক্ষার্থীর গলায় গামছা পেঁচানো ঝুলন্ত লাশের খবর পেয়ে রামপুরা থানার একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পরে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। সুরতহাল প্রস্তুতের সময় শিশুটির পায়ুপথে অস্বাভাবিক যৌনাচারের আলামত দেখতে পান তদন্ত কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, মো. শিহাব হোসেনের বিরুদ্ধে আরও চার শিক্ষার্থীর সঙ্গে অস্বাভাবিক যৌনাচারে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে পরে আব্দুল্লাহর মা মোছা. টুকু আরা খাতুন রামপুরা থানায় এসে শিহাব হোসেন ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী/২০০৩) এর ৯(১) ধারা এবং পেনাল কোডের ৩০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ বলেছেন, মাদরাসায় বলাৎকার ও অশালীন ঘটনাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে, ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি রোধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে। শনিবার সকালে আগারগাঁওতে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে যোগ দিয়ে তিনি এ সব কথা বলেন। তিনি বলেন,মাদরাসার মতো পবিত্র স্থানে যাতে এমন গর্হিত কাজ না হয়, সে বিষয়ে ইমামদের সচেতনতামূলক বক্তব্য প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।