লাভজনক পদে থেকে মনোনয়ন

বিএনপির মাধবী মার্মার মনোনয়ন বৈধতা চ্যালেঞ্জে ইসিতে আপিল

Any Akter
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৪:৪০ অপরাহ্ন, ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৪:৪০ অপরাহ্ন, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন ঘিরে আবারও সামনে এসেছে আইনের শাসন ও নির্বাচনী নৈতিকতার প্রশ্ন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাধবী মার্মার বিরুদ্ধে ‘লাভজনক পদে বহাল থাকা অবস্থায় মনোনয়ন দাখিল’ করার অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক চন্দ্রা চাকমা। বিষয়টি এখন শুধু একটি প্রার্থিতার বৈধতা নয়—বরং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সমতার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে রোববার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে দাখিলকৃত মনোনয়নপত্রের বিরুদ্ধে আপিল গ্রহণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই মাধবী মার্মার মনোনয়নকে ‘আইনবিরোধী’ দাবি করে আনুষ্ঠানিক আপিল জমা দেন চন্দ্রা চাকমা।

আরও পড়ুন: এনসিপিতে যোগ দিলেন ইসহাক সরকার, মহিউদ্দিন রনি ও নুরুজ্জামান কাফি

আপিলে অভিযোগ করা হয়, মাধবী মার্মা বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের একজন সদস্য হিসেবে ‘লাভজনক পদে’ বহাল ছিলেন। সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, এমন পদে অধিষ্ঠিত থেকে জাতীয় সংসদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হলে পূর্বে পদত্যাগ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই শর্ত পূরণ না করেই তিনি ২১ এপ্রিল মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন—যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে চন্দ্রা চাকমা বলেন,

আরও পড়ুন: এনসিপির নজরে ‘অভিমানী’ ও ‘বঞ্চিত’ নেতাকর্মী

“আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। একজন প্রার্থী যদি রাষ্ট্রীয় বা লাভজনক পদে থেকে মনোনয়ন দেন, তাহলে তা শুধু আইনের লঙ্ঘনই নয়, বরং নির্বাচনী সমতার পরিপন্থী। আমরা চাই নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিক।”

তিনি আরও দাবি করেন, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি দৃষ্টান্ত। “যদি আইন ভঙ্গ করেও কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, তাহলে সাধারণ প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ কোথায়?”—প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তবে অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন মাধবী মার্মা। তার দাবি, তিনি ২০ এপ্রিলই জেলা পরিষদের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তা জমা দিয়েছেন।

“আমি আইন মেনেই পদত্যাগ করেছি। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন,”—বলেন তিনি।

মনোনয়নপত্রে পদত্যাগের বিষয়টি উল্লেখ না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, নির্ধারিত ফরমে এ ধরনের তথ্য দেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট ঘর বা নির্দেশনা ছিল না।

এদিকে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, মাধবী মার্মার পদত্যাগপত্র ২০ এপ্রিল জমা দেওয়া হলেও সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে রোববার। পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মুহা. আবুল মনসুর বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, “পদত্যাগপত্রটি আজ হাতে পেয়েছি। তবে কবে কার্যকর হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত নই।”

এই অবস্থায় মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—মনোনয়ন দাখিলের সময় প্রার্থী কার্যত পদে বহাল ছিলেন কি না, এবং পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া ও গ্রহণের সময়ের মধ্যে আইনি বৈধতা কীভাবে নির্ধারিত হবে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আপিলের শুনানিতে এসব বিষয় যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। আইন অনুযায়ী, আপিলে মনোনয়ন বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট আসনে নতুন করে ভোটের ব্যবস্থা করা হতে পারে, যেখানে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

উল্লেখ্য, গত ৮ এপ্রিল সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। মনোনয়ন জমার শেষ সময় ছিল ২১ এপ্রিল। এর একদিন আগে, ২০ এপ্রিল বিএনপি ৩৬ জন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়, যার মধ্যে মাধবী মার্মাও রয়েছেন।

একই দিনে আরেক প্রার্থী, এনসিপি নেত্রী মনিরা শারমিনও তার মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। তার আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হবে সোমবার।

সংরক্ষিত নারী আসনের এই নির্বাচন এখন শুধু সংখ্যার লড়াই নয়—বরং আইনের শাসন, রাজনৈতিক নৈতিকতা এবং সমান প্রতিযোগিতার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, এই বিতর্ক গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি আরও প্রশ্নের জন্ম দেবে।