লংমার্চে ১১ দলের শক্তি প্রদর্শন, লংমার্চের আপত্তি জানিয়ে আলোচনার আহ্বান বিএনপির

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৯:০৫ অপরাহ্ন, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৯:০৫ অপরাহ্ন, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে রাজপথে বড় ধরনের শক্তি প্রদর্শন করেছে ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোট। প্রায় দেড় হাজার গাড়ির বহর নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চের মধ্য দিয়ে সরকারকে সরাসরি রাজনৈতিক চাপের বার্তা দিয়েছে জোটটি। পথে পথে সমাবেশ, মহাসড়কে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি এবং চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে বিশাল সমাপনী সমাবেশে নেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ, জনদুর্ভোগের অভিযোগ এবং দাবি আদায়ে আন্দোলন আরও জোরদারের হুঁশিয়ারি।

অন্যদিকে সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতারা লংমার্চের সময়, ধরন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসও পূর্ণ হওয়ার আগে সরকারের বিরুদ্ধে এমন কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে তাড়াহুড়ো; জ্বালানি সংকটের সময় বিপুল গাড়িবহর নিয়ে লংমার্চ আবার জাতীয় সম্পদের অপচয় ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বর্তমান জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের বড় অংশই আগের সরকারের রেখে যাওয়া। বিরোধীদের রাজপথের কর্মসূচির পাশাপাশি সংকট সমাধানে সংসদে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত বিকল্প পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম অভিমুখী ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে লাখো নেতাকর্মী নিয়ে শোডাউন দিল জামায়াত

শনিবার সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় লংমার্চ। এর আগে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা করা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হয় কর্মসূচি। পথে নয়টি স্থানে সমাবেশ করে ১১ দলীয় জোট। এসব কর্মসূচিতে জোটের শীর্ষ নেতারা সরকারের নানা নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।

‘সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি করছে’: 

আরও পড়ুন: মানুষ বলছে আর কখনো বিএনপিকে ভোট দেব না: অলি আহমদ

লালদীঘি ময়দানের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সরকার রক্ষা করেনি। তাঁর অভিযোগ, ওয়াদা দিয়ে তা লঙ্ঘন করে সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি ও প্রতারণা করছে।

জনগণের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের কারণে মানুষ অতিষ্ঠ। গ্যাস নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই; অথচ গ্যাসের বিল ও বিদ্যুতের ‘ভূতুড়ে বিল’ ঠিকই দিতে হচ্ছে। পানির সংকট নিয়েও কথা বলার সুযোগ নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সিফাত নামের এক তরুণের গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, অতিষ্ঠ হয়ে ওই তরুণ কী বলেছে, তার জন্য তাকে এমনভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যেন বাংলাদেশ উল্টেপাল্টে গেছে। তাঁর ভাষায়, সিফাতের ব্যবহৃত ভাষার পক্ষে তাঁরা নন; কিন্তু যে বিষয়ে সে প্রতিবাদ করেছে, সেই বিষয়ে দেশের ১৮ কোটি মানুষ প্রয়োজনে ‘সিফাত হয়ে’ গর্জে উঠবে।

ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, তাঁরা কোনো দল বা ব্যক্তিগোষ্ঠীর জন্য রাজপথে নামেননি; বাংলাদেশের মানুষের দাবি আদায়ের জন্যই নেমেছেন। জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে জনগণও কাউকে ছাড় দেবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

পাল্টা বক্তব্য: ‘ছয় মাসও সময় দেওয়া হয়নি’: 

সরকারের পক্ষে পাল্টা যুক্তি এসেছে মূলত লংমার্চের সময় ও সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মেয়াদ নিয়ে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি বলেন, আন্দোলন করা বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসও পূর্ণ হওয়ার আগে লংমার্চের মতো কর্মসূচি দেওয়া অনুচিত।

তিনি বলেন, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারকে আরও কিছুদিন সময় দিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা উচিত ছিল। সরকারি দল রাজপথে বিরোধীদের বিরুদ্ধে কোনো সংঘাতময় কর্মসূচি দেবে না বলেও জানান তিনি। জনগণই বিরোধীদের কর্মসূচির ভালো-মন্দ বিচার করবে বলে মন্তব্য করেন চিফ হুইপ।

ছয় দফা থেকে এক দফা: 

লংমার্চের সবচেয়ে সরাসরি রাজনৈতিক বার্তাগুলোর একটি আসে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, সরকার ছয় দফা দাবি মেনে না নিলে তা এক দফায় রূপ নেবে। আর সেই এক দফা হবে সরকারের পদত্যাগ।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, দাবিগুলো মেনে নেওয়া উচিত। তা না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হবে। লংমার্চের মধ্য দিয়ে সরকারের ‘গদি নড়ে গেছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকও একই ধরনের সতর্কবার্তা দেন। তাঁর বক্তব্য, জনগণের রায় বাস্তবায়ন এবং জনদুর্ভোগ কমাতে সরকার ব্যর্থ হলে জনতার মিছিল আরও দীর্ঘ হবে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত গণজোয়ার সৃষ্টি হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

ভোট ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে সরকার ক্ষমতায় এসেছে—এমন অভিযোগও করেন মামুনুল হক। তাঁর দাবি, দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে বিষয়টি তাঁরা মেনে নিয়েছেন। তবে জনগণের রায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা চলতে থাকলে সরকারের পরিণতি অতীতের সরকারের মতো হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

পাল্টা বক্তব্য: রাজপথ নয়, সংসদে সমাধানের আহ্বান: 

সরকারপক্ষের বক্তব্য, সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য বিরোধী দলের হাতে সংসদীয় পদ্ধতিতেই কার্যকর সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সংসদীয় রাজনীতিতে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের সুযোগ রয়েছে। তাই সংসদীয় বিতর্ক দ্রুত রাজপথে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য সহায়ক নয়।

তিনি বলেন, সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা বিরোধী দলের দায়িত্ব। তবে অহেতুক ও দ্রুত সংসদীয় বিতর্ক রাজপথে নিয়ে যাওয়া এবং লংমার্চের মতো কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

জহির উদ্দিন স্বপনের মতে, শুধু সরকারকে ‘ফাঁদে ফেলার’ উদ্দেশ্যে সংসদীয় রাজনীতি পরিচালনা করা উচিত নয়। সমালোচনার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিলে তা দেশ পরিচালনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

জ্বালানি সংকট: ব্যর্থতা কার? : 

১১ দলীয় জোটের লংমার্চের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাস সংকট নিরসন। জামায়াত আমিরের বক্তব্যে জ্বালানি সংকটকে জনগণের দুর্ভোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকলেও বিল দিতে হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে সরকারের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

এনসিপির নেতারাও জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে দাবি বাস্তবায়নে চাপ বাড়ানোর কথা বলেন।

সরকারের জবাব: ‘সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া’ : 

সরকারপক্ষের বক্তব্য, জ্বালানি সংকটের পুরো দায় বর্তমান সরকারের নয়। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন তারা একটি ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি’ ও ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত গণতন্ত্রের’ ওপর দাঁড়িয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়।

বিগত সরকারের বিভিন্ন চুক্তি ও নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময় অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার দায়ভার এখন বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপনও বলেন, দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভরতা ও ভুল নীতির কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত চাপে রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ না নেওয়াকে তিনি শুধু দুর্নীতি নয়, জাতির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতারণা হিসেবেও উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, সরকার বিকল্প জ্বালানি উৎসের সন্ধান এবং নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করছে।

‘লংমার্চেই এক লাখ লিটার তেল?’ : 

জ্বালানি সংকটের সময়ে বিপুল গাড়িবহর নিয়ে লংমার্চ আয়োজনের বিষয়টিকেই সরকারের অন্যতম প্রধান পাল্টা যুক্তি হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, লংমার্চের নামে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যয় জাতীয় সম্পদের অপচয়। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, কর্মসূচিতে প্রায় এক লাখ লিটার জ্বালানি তেল ব্যয় হতে পারে।

তিনি বলেন, কর্মসূচিটি জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি করবে এবং জাতীয় সম্পদ নষ্ট করবে। তাঁর বক্তব্য, প্রথমদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে লংমার্চের কথা বলা হলেও পরে গণরায় বাস্তবায়নের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।

১১ দলের যুক্তি: সংকটের প্রতিবাদেই রাজপথ : 

জোটের নেতাদের বক্তব্য, জ্বালানি সংকটই তাঁদের ছয় দফা দাবির অন্যতম প্রধান বিষয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির প্রতিবাদ এবং জনগণের অধিকার আদায়ের জন্যই তাঁরা রাজপথে নেমেছেন।

অর্থাৎ সরকারের কাছে লংমার্চ যেখানে জ্বালানি সংকটের সময়ে অতিরিক্ত তেল ব্যয়ের উদাহরণ, ১১ দলের কাছে একই কর্মসূচি সেই জ্বালানি সংকটের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠনের রাজনৈতিক হাতিয়ার।

নির্বাচন কমিশন নিয়েও মুখোমুখি অবস্থান : 

লংমার্চে নির্বাচন কমিশন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও সরব হন এনসিপির সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।

তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে বিএনপির দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ‘দখলের পরিকল্পনা’ করা হচ্ছে।

আখতার হোসেন বলেন, দেশে আর আওয়ামী লীগের স্টাইলে একতরফা, রাতের ভোট কিংবা দখলদারিত্বের নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। গণঅভ্যুত্থানের অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিও জানান তিনি।

পাল্টা বক্তব্য: ‘সংসদে জবাবদিহির সুযোগ রয়েছে’ : 

সরকারপক্ষের বক্তব্য, নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের জবাব রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই দেওয়া হবে। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, আগামী সংসদ অধিবেশনে দেশের বর্তমান সংকট ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বিভিন্ন দলের দেওয়া নোটিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

সরকারের যুক্তি হলো, সংসদ কার্যকর থাকা অবস্থায় বিরোধী দলের সংসদীয় ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন; অন্যদিকে বিরোধীদের অবস্থান—সংসদে আলোচনা যথেষ্ট নয়, জনগণের সংকটের সমাধানে সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিএনপির বিরুদ্ধেও অভিযোগ ১১ দলের : 

১১ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান লংমার্চের সমাবেশে বিএনপির বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, বিএনপি বিভিন্ন স্থানে হত্যা, বাড়ি-জমি দখল এবং চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত।

তিনি অভিযোগ করেন, মানুষকে জিম্মি করে কিস্তিতে চাঁদা তোলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে ক্ষমতা ছাড়ার দাবিও জানান তিনি।

বিএনপির পাল্টা অবস্থান : 

বিএনপির পক্ষ থেকে ১১ দলের এ অভিযোগের সরাসরি বক্তব্য না এলেও দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা লংমার্চের রাজনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, বর্তমান সরকার যে পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে, তা বিবেচনায় না নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই বিরোধীদের রাজপথে নেমে পড়া জনগণই মূল্যায়ন করবে।

অর্থাৎ ১১ দল যেখানে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটকে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছে, বিএনপির অবস্থানে বর্তমান সরকারের হাতে থাকা সময় ও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকটকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

‘জামায়াতের রাজনীতি দেশকে ভয়ংকর পরিস্থিতিতে নিতে পারে’

লংমার্চের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতে ইসলামীকে নিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা এসেছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর বলেন, জামায়াতের নেতাকর্মীদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ও ভালো লাগা থাকলেও তারা যে পর্যায়ের রাজনীতি করছে, তা দেশকে ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত-শিবিরের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে দাবি করে তিনি ভুয়া আইডি, অশালীন ভাষা ও পরিকল্পিত আক্রমণের অভিযোগ তোলেন। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের ‘সাইবার সন্ত্রাস’ বন্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

জামায়াতের বক্তব্য: ‘জনগণের অধিকারই মূল বিষয়’ : 

জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব অবশ্য এ ধরনের সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে লংমার্চের মূল দাবিগুলোকেই সামনে রেখেছে। ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে বারবার এসেছে জনগণের অধিকার, দ্রব্যমূল্য, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সংকট এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ।

জামায়াতের অবস্থান—কর্মসূচির উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় আনা নয়; জনগণের দাবি আদায়। অন্যদিকে সরকারের মিত্রপক্ষের বক্তব্য—রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যা নতুন অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়।

‘সংসদে পরিকল্পনা দিন’—রিজভীর আহ্বান : 

লংমার্চের আগের দিন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলকে বিকল্প পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বান জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের জন্য লংমার্চ বা কর্মসূচি দেওয়া বিরোধীদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ কীভাবে সরবরাহ করা যায়, কোথা থেকে পাওয়া যাবে এবং সংকট মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত—সে বিষয়ে বিরোধীদের বিকল্প পরিকল্পনা দেওয়া প্রয়োজন।

সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের কথা বলার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেওয়াও বিরোধী দলের দায়িত্ব।

রাজপথ বনাম সংসদ—রাজনীতির নতুন মেরুকরণ

১১ দলীয় জোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ শুধু ছয় দফা দাবির কর্মসূচি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর মধ্য দিয়ে সরকারবিরোধী রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। ছয় দফা দাবি থেকে এক দফায়—অর্থাৎ সরকারের পদত্যাগের হুঁশিয়ারি—রাজনৈতিক কর্মসূচিটিকে আরও কঠোর অবস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন জোটের নেতারা।

অন্যদিকে সরকার ও বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসও পূর্ণ হয়নি। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, জ্বালানি সংকট ও ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান সামাল দিতে সরকারকে সময় দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংসদীয় বিতর্ককে রাজপথে না নিয়ে সংসদে গঠনমূলক প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

তবে রাজপথের বাস্তবতা বলছে, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ইতোমধ্যে সরকারের কাছে সময়ের পরিবর্তে দৃশ্যমান ফলাফল দাবি করতে শুরু করেছে। আর সরকারপক্ষের অবস্থান—সংকটের দায় এককভাবে বর্তমান সরকারের ওপর চাপিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা গ্রহণযোগ্য নয়।

জনভোগান্তির প্রশ্নও সামনে : 

লংমার্চে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ ১১ দলীয় জোটের সাংগঠনিক শক্তির জানান দিলেও কর্মসূচির কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচলে ধীরগতি ও যানজটের সৃষ্টি হয়। নেতাকর্মীদের অবস্থান এবং বিশাল গাড়িবহরের কারণে সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন চালকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় পাল্টা প্রশ্ন—জনদুর্ভোগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে নতুন করে জনদুর্ভোগ তৈরি করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

বিরোধী জোটের পাল্টা বক্তব্য—জনদুর্ভোগের মূল কারণ যদি জ্বালানি, বিদ্যুৎ, দ্রব্যমূল্য, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির মতো দীর্ঘস্থায়ী সংকট হয়, তাহলে সেই সংকটের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার গণতান্ত্রিক অধিকার তাদের রয়েছে।

সামনে আরও কঠিন রাজনৈতিক লড়াই? : 

লংমার্চের মধ্য দিয়ে ১১ দলীয় জোট যে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে, তা স্পষ্ট—সরকারের কর্মকাণ্ডে দ্রুত পরিবর্তন ও ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে রাজপথের আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারে। ইতোমধ্যে জোটের নেতাদের বক্তব্যে ছয় দফা থেকে এক দফায় যাওয়ার হুঁশিয়ারিও এসেছে।

অন্যদিকে সরকার বলছে, রাজপথের চাপের কাছে নীতিনির্ধারণ নয়; সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যেই সংকটের সমাধান হওয়া উচিত। সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগের কথা বলছে। বিরোধীদের কাছেও চাওয়া হচ্ছে সুনির্দিষ্ট বিকল্প পরিকল্পনা।

ফলে আগামী দিনের রাজনীতির প্রধান দ্বন্দ্ব এখন অনেকটাই স্পষ্ট—বিরোধীদের দাবি, জনগণের সংকটের দ্রুত সমাধান; সরকারের পাল্টা বক্তব্য, সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এবং সমাধানের জন্য সময় ও সহযোগিতা প্রয়োজন।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ১১ দলীয় জোটের লংমার্চ সেই দ্বন্দ্বকে রাজপথে দৃশ্যমান করে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন, লংমার্চের এই শক্তি কতটা দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয় এবং সরকার কত দ্রুত জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতিসহ জনজীবনের সংকটগুলোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে। এর ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ।