তিন দেশে একসঙ্গে বর্ণিল উদ্বোধনী উৎসব
মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে কাল বিশ্বকাপের মহাপর্দা উন্মোচন
অবশেষে শেষ হচ্ছে অপেক্ষার প্রহর। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর দৃষ্টি এখন উত্তর আমেরিকায়। আগামীকাল মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠছে ফিফা বিশ্বকাপের। মাঠে বল গড়ানোর আগে তিন আয়োজক দেশ—মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সংগীত, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি আর ফুটবলের অনন্য সমন্বয়ে বিশ্বকাপের সূচনা হতে যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব বৈশ্বিক উৎসবে।
ফুটবল বিশ্ব আবারও প্রস্তুত চার বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে। আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপের নতুন অধ্যায়, যেখানে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার দাপুটে জয়
মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে মোট ১০৪টি ম্যাচ। প্রায় দেড় মাসব্যাপী এই মহাযজ্ঞের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে স্বাগতিক মেক্সিকো ও আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি ভেন্যু এস্তাদিও আজতেকায়।
ফুটবল কিংবদন্তি পেলে ও ডিয়েগো ম্যারাডোনার অমর স্মৃতিবিজড়িত এই স্টেডিয়াম আবারও সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের নতুন এক যাত্রার।
আরও পড়ুন: শেরে বাংলায় ঐতিহাসিক জয়: অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ, সিরিজে এগিয়ে টাইগাররা
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য শুধু যৌথ আয়োজন নয়, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হবে তিন দেশে সমান্তরালভাবে।
মেক্সিকো সিটি, টরন্টো এবং লস অ্যাঞ্জেলেসে আলাদা আলাদা আয়োজন থাকলেও সবগুলো অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য থাকবে এক—ফুটবল বিশ্বকে একত্রিত করে, সীমান্ত নয়; মানুষের বন্ধনই সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রতিটি অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট দেশের উদ্বোধনী ম্যাচের প্রায় ৯০ মিনিট আগে শুরু হবে। আয়োজকরা বলছেন, এটি হবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় উদ্বোধনী আয়োজনগুলোর একটি।
বিশ্বকাপের প্রথম দিনের সবচেয়ে বড় আয়োজন হবে মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকায়।
দেশটির ঐতিহ্যবাহী ‘পাপেল পিকাডো’ শিল্প, লোকজ সংস্কৃতি, নৃত্য এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর আলোকসজ্জার মাধ্যমে তুলে ধরা হবে মেক্সিকোর হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
মঞ্চে পারফর্ম করবেন বিশ্বখ্যাত পপ তারকা শাকিরা, লাতিন সংগীতের জনপ্রিয় মুখ জে বালভিন, কিংবদন্তি ব্যান্ড মানা এবং মেক্সিকান শিল্পী লিলা ডাউনসসহ আরও অনেকে।
আয়োজকদের আশা, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি লাতিন আমেরিকার সাংস্কৃতিক শক্তির এক অনন্য প্রদর্শনী হয়ে উঠবে।
কানাডার আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে দেশটির বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়।
টরন্টো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল থিম ‘কালচারাল মোজাইক’। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মানুষের সহাবস্থান এবং সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে উদ্যাপন করা হবে এই আয়োজনে।
মঞ্চ মাতাবেন আলানিস মরিসেট, মাইকেল বুবলে, এলেসিয়া কারা, জেসি রেইজস, নোরা ফাতেহিসহ জনপ্রিয় শিল্পীরা।
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে কানাডার জন্য এই অনুষ্ঠান বিশেষ আবেগেরও উপলক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে প্রযুক্তি, বিনোদন ও আধুনিক ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনার এক চমকপ্রদ প্রদর্শনী।
লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অত্যাধুনিক ডিজিটাল গ্রাফিক্স, ড্রোন শো, আলোকসজ্জা এবং বিশাল মঞ্চসজ্জার সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে এক অভিনব আয়োজন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন কেটি পেরি, ফিউচার, আনিতা, এলএল কুল জে এবং রেমাসহ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তারকারা।
এবারের বিশ্বকাপকে ফিফা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আগের তুলনায় বেশি ম্যাচ, বেশি ভেন্যু এবং বিস্তৃত আয়োজনে টুর্নামেন্টটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশের বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক পরিসরে ছড়িয়ে থাকা স্টেডিয়ামগুলোতে বিশ্বের সেরা দলগুলো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নামবে।
আয়োজকদের মতে, এটি শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়; বরং বিশ্ব সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও বিনোদনের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানগুলোর সৃজনশীল পরিচালনায় রয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রযোজক মার্কো বালি। অলিম্পিকসহ একাধিক বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
তিনি জানিয়েছেন, তিন দেশের তিনটি অনুষ্ঠান আলাদা হলেও সবার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ফুটবল, মানবিক সংযোগ এবং বৈশ্বিক ঐক্যের বার্তা।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোও উদ্বোধনী আয়োজনকে বিশ্বব্যাপী সম্প্রীতি ও উদ্যাপনের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বকাপ এমন একটি আয়োজন যা ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভূগোলের বিভাজন ভুলিয়ে পুরো বিশ্বকে এক পরিবারে পরিণত করে।
জমকালো উদ্বোধনী আয়োজন শেষে শুরু হবে প্রি-ম্যাচ অনুষ্ঠান, খেলোয়াড়দের ওয়ার্ম-আপ এবং আনুষ্ঠানিক কিক-অফ কার্যক্রম। এরপরই মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে গড়াবে বিশ্বকাপের প্রথম বল।
সেখান থেকেই শুরু হবে বিশ্বসেরার মুকুট জয়ের লড়াই।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি শুধু একটি ম্যাচ নয়; বরং এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা স্বপ্ন, আবেগ, নাটকীয়তা ও ইতিহাস রচনার যাত্রার সূচনা। উত্তর আমেরিকার আকাশে তাই ইতোমধ্যেই বাজতে শুরু করেছে বিশ্বকাপের দামামা, আর গোটা বিশ্বের চোখ এখন নিবদ্ধ ফুটবলের এই মহামঞ্চে।





