মাতৃভাষা দিবসের রফিকুল ইসলামের ম্যুরাল ভাঙচুর: ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অন্যতম রূপকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলামের স্মরণে নির্মিত ম্যুরালটি ভেঙে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। কুমিল্লা কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে স্থাপিত এই ম্যুরাল ভাঙার ছবি বুধবার (২৬ জুন) সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
ম্যুরাল ভাঙার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষার্থী ও সচেতন মহল। অনেকেই একে দেশের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ম্যুরালটি দ্রুত পুনঃস্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: খেজুর, চিনি ও ভোজ্যতেল খালাসে থাকবে অগ্রাধিকার
কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শফিউল আহমেদ বাবুল গণমাধ্যমকে বলেন, “মাতৃভাষাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে রফিকুল ইসলামের অবদান অনস্বীকার্য। তার নামে নির্মিত একটি স্মারক ভেঙে ফেলা খুবই দুঃখজনক। আমরা চাই, জেলা প্রশাসন দ্রুত এটি পুনরায় স্থাপন করুক।”
রাতেই জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়ছার সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে রফিকুল ইসলামের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে আমরা ম্যুরালটি পুনঃস্থাপনসহ প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
আরও পড়ুন: শ্রীপুরে নিখোঁজ তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে উঠল গৃহবধূর মরদেহ
১৯৯৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রফিকুল ইসলাম জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানকে একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের অবদান তুলে ধরে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। পরে তার সহযোদ্ধা আবদুস সালামসহ গঠন করেন ‘এ গ্রুপ অব মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের সংগঠন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে সংগঠনটি একুশে পদকে ভূষিত হয়।
২০১৪ সালে কুমিল্লা নগরীর রাজবাড়ি এলাকায় কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপন করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পাশেই রফিকুল ইসলামের পরিবারের উদ্যোগ ও জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি শহীদ মিনার ও ম্যুরাল নির্মিত হয়। ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এর উদ্বোধন করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক হাসানুজ্জামান কল্লোল এবং রফিকুল ইসলামের স্ত্রী বুলি ইসলাম।
প্রতিষ্ঠানটির সাবেক অধ্যক্ষ নারগিছ আক্তার বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই স্থাপনা সংরক্ষণ করে আসছিলাম। এখানেই শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয়রা শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন।
ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় একাধিক শিক্ষক ও বাসিন্দা গণমাধ্যমের সামনে কথা বলতে অনিচ্ছুক। অনেকেই ভয়ের কারণে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন, যা পুরো বিষয়টিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষা আন্দোলনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে মুখ্য ভূমিকা রাখা রফিকুল ইসলামের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙার ঘটনা জাতির ইতিহাস ও গৌরবের ওপর একটি নির্মম আঘাত। দ্রুত ম্যুরাল পুনঃস্থাপন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।





