নির্জন সড়ক, অন্ধকার গলি আর ফাঁকা প্লটে অপরাধের রাজত্ব, পূর্বাচল কি হয়ে উঠছে ক্রাইম জোন

Sanchoy Biswas
শ্রী দিপু চন্দ্র গোপ, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৫:৩৮ অপরাহ্ন, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৪:২৬ পূর্বাহ্ন, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীর উপকণ্ঠে গড়ে ওঠা পরিকল্পিত আধুনিক নগরী হিসেবে পরিচিত পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প, যেখানে থাকার কথা ছিল নিরাপদ নাগরিক জীবন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু বাস্তবতায় সেই স্বপ্নের শহরই এখন স্থানীয়দের কাছে আতঙ্কের আরেক নাম। একের পর এক অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকাটি কার্যত পরিণত হয়েছে একটি ডাম্পিং জোনে। নিরাপত্তাহীনতা, ভয় আর উৎকণ্ঠার মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা ও আশপাশের সাধারণ মানুষ।

স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে পূর্বাচলে সন্ধ্যার পর বাইরে বের হলেই ভয় কাজ করে। চারদিকে ফাঁকা প্লট, অন্ধকার সড়ক, ঝোপঝাড় ও জনমানবশূন্য পরিবেশ থাকায় স্বাভাবিক চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায়ই শোনা যায় লাশ উদ্ধারের খবর, পাশাপাশি ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনাও আগের তুলনায় বেড়েছে। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরা এবং নিয়মিত পুলিশ টহল না থাকায় অপরাধীরা খুব সহজেই ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। দ্রুত কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এলাকাবাসী।

আরও পড়ুন: শ্রীপুরে নিখোঁজ তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে উঠল গৃহবধূর মরদেহ

জানা গেছে, ১৯৯৩ সালে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৬ সালে এসেও রয়ে গেছে উন্নয়ন কাজের বড় একটি অংশ অসম্পূর্ণ। প্রায় ৬,৫০০ একর বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে অসংখ্য ফাঁকা প্লট, জঙ্গল, ঝোপঝাড় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন সড়ক। এসব নির্জন ও অরক্ষিত এলাকা এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জানায়, পূর্বাচলে উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কিভাবে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য শহরের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব?

আরও পড়ুন: ঈদুল ফিতরের আগেই চালু হচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি: ত্রাণমন্ত্রী

অপরদিকে স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, পূর্বাচলের বিশাল অংশ দীর্ঘদিন ধরে অর্ধসমাপ্ত থাকায় সেখানে খুব সহজেই অপরাধীরা আত্মগোপন করতে পারছে। ফাঁকা প্লট ও অন্ধকার সড়কগুলোই অপরাধ বৃদ্ধির বড় সহায়ক হয়ে উঠেছে। স্বপ্নের শহর হিসেবে যাত্রা শুরু করা পূর্বাচল এখন যেন আতঙ্কের শহরে রূপ নিয়েছে। দ্রুত কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন, সড়কবাতির ব্যবস্থা জোরদার এবং একটি স্থায়ী থানা বা পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন না করা হলে ভবিষ্যতে এই শহর অপরাধীদের স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

স্থানীয় আদিবাসীরা বলেন, এটা এখন আর শহর মনে হয় না। পুরো এলাকাটাই যেন ভয়ঙ্কর এক ক্রাইম জোনে পরিণত হয়েছে। এখানে কোনো স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বা থানা নেই। সন্ধ্যার পর আমরা কেউই ঘরের বাইরে বের হতে সাহস পাই না। প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যেই থাকতে হচ্ছে। আমরা চাই, নতুন সরকার দ্রুত এই শহরের কাজ শেষ করার পাশাপাশি শক্ত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিশ্চিত করুক।

যুবদল নেতা সোহেল মিয়া বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, একটি পরিকল্পিত আধুনিক শহর হয়েও পূর্বাচলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। দ্রুত সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত টহল নিশ্চিত করা না হলে অপরাধ আরও বাড়বে। মানুষের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সাংবাদিক মোমেন মিয়া বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, পূর্বাচলের বিশাল অংশ এখনো অর্ধসমাপ্ত থাকায় ফাঁকা প্লট, জঙ্গল ও নির্জন সড়ক অপরাধীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বারবার লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটলেও স্থায়ী সমাধান চোখে পড়ছে না। সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা ছাড়া এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।

স্থানীয় প্রাইভেটকার চালক লিটন মিয়া বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, রাতে যাত্রী নিয়ে এই এলাকায় ঢুকতে খুব ভয় লাগে। অনেক জায়গায় আলো নেই, রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে। ছিনতাই বা ডাকাতির আশঙ্কা নিয়ে প্রতিদিন কাজ করতে হয়।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ (‘গ’ সার্কেল) এর সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, কাঞ্চন থেকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত পূর্বাচল এলাকার পুরো অংশে কার্যকর কোনো সিসি ক্যামেরা নেটওয়ার্ক নেই। সিসি ক্যামেরা না থাকায় সন্ত্রাসীরা এ এলাকাকে নিরাপদ জায়গা হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এ কারণেই বিভিন্ন সময়ে এখানে লাশ উদ্ধারের মতো ঘটনাও ঘটছে। তিনি বলেন, যদি পুরো পূর্বাচল এলাকাকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা যায়, তাহলে অপরাধ অনেকটাই কমে আসবে।

তিনি আরও বলেন, এলাকায় নজরদারি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে দ্রুত সিসি ক্যামেরা স্থাপন, নিয়মিত টহল জোরদার এবং একটি স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন এখন সময়ের দাবি।

এলাকাবাসীর একটাই দাবি, রূপগঞ্জ উপজেলা, নারায়ণগঞ্জ জেলা এলাকায় অবস্থিত পূর্বাচলের উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি শক্ত ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে পূর্বাচলকে সত্যিকার অর্থেই একটি আধুনিক, নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য শহরে রূপান্তর করা হোক।