সুরঞ্জিত হত্যাচেষ্টা মামলা
কে এই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ‘বলির পাঁঠা’ আসামি হাফেজ নাঈম?
- দুই দশকের সিলেটের সব হাই-প্রোফাইল মামলার আসামি
- পরিবারের দাবি ফাঁসানো হয়েছে, উচ্চ আদালতে আপিলের ঘোষণা
- মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিলের দাবিতে সিলেট উত্তাল: কঠোর হুঁশিয়ারি আলেম সমাজের
দীর্ঘ দুই দশক পর সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের রাজনৈতিক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ও হত্যাচেষ্টা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী এবং সাবেক হুইপ জি কে গৌছসহ অন্য নয় হেভিওয়েট রাজনৈতিক আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। তবে পুরো মামলার একমাত্র আসামি হিসেবে হাফেজ সৈয়দ নাঈম আহমদ আরিফকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার বহুল প্রতীক্ষিত ও চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়কে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণ ও এর আশপাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। রায় ঘোষণার পরপরই খালাস পাওয়া নেতাকর্মীদের সমর্থকেরা আনন্দ-উল্লাস করলেও দণ্ডপ্রাপ্ত নাঈমের পরিবার ও সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা গেছে।
আরও পড়ুন: অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, গুলিতে নিহত বিএনপি কর্মী
যা ঘটেছিল দিরাইয়ের সেই সমাবেশে:
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ জুন সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন শীর্ষ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সমাবেশ চলাকালে আকস্মিক ভয়াবহ এক গ্রেনেড হামলায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সভাস্থল। ওই হামলায় যুবলীগের এক কর্মী নিহত হন এবং অন্তত ২৯ জন গুরুতর আহত হন। তবে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
আরও পড়ুন: দুই যুগের অপেক্ষার অবসান: শ্রীপুরে শতাধিক পরিবার পেল বিদ্যুতের সংযোগ
ঘটনার পর দিরাই থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) হেলাল উদ্দিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২০ সালে লুৎফুজ্জামান বাবর, আরিফুল হক চৌধুরীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে এই মামলার বিচার শুরু হয়েছিল।
কে এই হাফেজ নাঈম?
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাফেজ সৈয়দ নাঈম আহমদ আরিফের বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর এলাকায়। তার পিতার নাম সৈয়দ আবুল কালাম ও মাতা মোছা. সালমা খাতুন। নাঈম ছাত্রজীবনে সৈয়দপুর ইউনিয়ন ছাত্র জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং সৈয়দপুর মাদরাসায় জালালাইন জামাতের ছাত্র থাকাকালীন গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘ ২০ বছর জেল খেটে এক মাস আগে জামিনে মুক্তি পান তিনি। টগবগে হাফেজ নাঈম কারাগারে থাকাবস্থায় পিতামাতাসহ অনেক আত্মীয়-স্বজনকে হারিয়েছেন। জামিনে বেরিয়ে হতাশা ঝেড়ে জীবনসংগ্রামে নামার স্বপ্ন বুনছিলেন তিনি। কিন্তু আজ আবার তাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনতে হলো।
গত দুই দশকে দেশের একাধিক বহুল আলোচিত ও হাই-প্রোফাইল বোমা হামলা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার মামলায় তার নাম জড়িয়েছে। এর মধ্যে সিলেটে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার মামলা (যেটিতে তিনি পরবর্তীতে খালাস পান), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশে বোমা হামলা, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর হামলা এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলাতেও নাঈম আহমদকে আসামি করা হয়েছিল। তবে দিরাইয়ের এই মামলাটিতেই প্রথম তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাজার রায় এলো।
পরিবারের দাবি নাঈম ‘বলির পাঁঠা’
রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাঈমের স্বজনেরা। তার ভাই সৈয়দ মারুফ আহমদ সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ভাইকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং ধর্মীয় লেবাসের কারণে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে তার দূরতম কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।’
পরিবার দাবি করে, দীর্ঘ ২০ বছর কারাভোগের পর সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন হাফেজ নাঈম। দীর্ঘ বন্দিজীবনের ট্র্যাজেডি উল্লেখ করে তারা বলেন, জেলে থাকার কারণে নাঈম তার বৃদ্ধ বাবা-মা কাউকেই শেষ সময়ে জীবিত দেখে যেতে পারেননি। পরিবার ও স্থানীয় সমর্থকদের অভিযোগ— এই মামলায় কোনো নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বা গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছিল না।
তদন্ত পর্যায়ে রিমান্ডে নিয়ে অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তার কাছ থেকে জোরপূর্বক একটি তথাকথিত ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ আদায় করা হয়েছিল, যার ওপর ভিত্তি করেই এই রায় দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা খালাস পেলেও, কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় না থাকায় এবং হুজুর হওয়ার কারণে নাঈমের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তার পরিবারের। নাঈমের বড় ভাই এই রায়ের বিরুদ্ধে অবিলম্বে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন।
কোরআনে হাফেজের মৃত্যুদণ্ড নিয়ে উত্তাল সিলেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড়
এদিকে এই রায়কে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। মামলার প্রধান আকর্ষণের জায়গা তৈরি হয়েছে আসামিদের সাজার বৈষম্য নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সাইফুল্লাহ সাদী’ নামের একজন লিখেন— ‘দীর্ঘ ২০ বছর পর মুক্তি পেয়েছিলেন হাফেজ নাঈম ভাই। জেল থেকে বের হয়ে বাবা-মা কাউকেই জীবিত পাননি। আজ সেই হাফেজ নাঈম ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ড হলো। অথচ একই মামলায় বাবর, আরিফ ও জি কে গৌছ খালাস পেয়েছেন। নেই কোনো সাক্ষী, নেই কোনো প্রত্যক্ষদর্শী, নেই কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ। আছে শুধু রিমান্ডে অসহনীয় নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা একটি স্বীকারোক্তি। যদি একই মামলায় অন্যরা খালাস পেতে পারে, তাহলে হাফেজ নাঈম ভাই কেন মৃত্যুদণ্ড পেলেন?’
রায়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলে উত্তাল সিলেট
এদিকে, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হত্যা প্রচেষ্টা মামলায় হাফেজ নাঈম আহমদ আরিফের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল এবং মামলার অন্যান্য আসামির মতো তাকে বেকসুর খালাস দেওয়ার দাবিতে সিলেটে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে যুব জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, সিলেট।
শুক্রবার (২৬ জুন) বাদ জুমা যুব জমিয়ত ও সাধারণ আলেম সমাজের ব্যানারে এসব প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, একই মামলায় একই ধারায় অভিযুক্ত অন্যান্য আসামিরা খালাস পেলেও একমাত্র হাফেজ সৈয়দ নাঈম আহমদ আরিফ (নিমু)-কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা তাদের মতে বৈষম্যমূলক ও অন্যায্য। তারা প্রশ্ন রাখেন, ‘একই মামলা, একই ধারা, অন্য সবাই খালাস পেলে নাঈম কেন জেলে?’ বক্তারা দাবি করেন, এই রায় বাতিল করে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।





