গ্যাস সংকটে কর্মহীন হওয়ার শঙ্কায় হাজারো শ্রমিক
গ্যাসের সরবরাহ অপ্রতুল ও চাপ কম থাকায় ময়মনসিংহের ভালুকার শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে কাজে যোগ দেওয়া শ্রমিকদের দুপুরের খাবারের সময়ের মধ্যেই ধাপে ধাপে ছুটি দিয়ে দেয় অন্তত ২০টি শিল্পকারখানা। শিল্প পুলিশ-৫ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘদিনের এ সংকটে কয়েকটি কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন মালিকেরা। এতে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে টেক্সটাইল, স্পিনিং ও ডাইং কারখানাগুলো। গৌরীপুরের টয়ো স্পিনিং মিলসে ৫০টি মেশিনের মধ্যে ৪৩টি বন্ধ রয়েছে। ভালুকার সীমা স্পিনিং মিলসের ৩০টি মেশিন পুরোপুরি বন্ধ থাকায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। বাশার স্পিনিং, নরটেক্স টেক্সটাইল ও ডেল্টা স্পিনার্সেও উৎপাদন ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে। এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইলে প্রায় ৪০ শতাংশ মেশিন অচল হয়ে পড়েছে। এক্সিলেন্ট সিরামিকসের ফার্নেস বন্ধ থাকায় উৎপাদন নেমে গেছে অর্ধেকের নিচে।
আরও পড়ুন: জয়পুরহাটে বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের স্প্রিং ভেঙে ট্রেন চলাচল বন্ধ
শিল্প পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার গোপীনাথ কাঞ্জিলাল জানান, গ্যাস সংকটের কারণে ছুটি দেওয়া ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাহাদি সোয়েটার্স লিমিটেড, সুলতানা সোয়েটার্স, লিজ ফ্যাশন, টিএম টেক্সটাইল, ত্রিশাল টেক্সটাইল ও বিএসপি স্পিনিং মিলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তিতাস গ্যাসের ভালুকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (সিস্টেম অপারেশন) শামীম হোসেন বলেন, ভালুকা এলাকায় ১৪০ ও ৫০ পিএসআইয়ের দুটি লাইনে গ্যাস সরবরাহের কথা থাকলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ পিএসআই। তিতাস গ্যাসের ভালুকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রায় ১৮০ থেকে ১৯০টি কারখানায় গ্যাস সংযোগ রয়েছে। মেইন লাইনে পিএসআই কিছুটা কম। তাঁর ভাষ্য, সমস্যাটি শুধু ভালুকার নয়, সারা দেশের এবং দ্রুতই এর সমাধান হবে।
আরও পড়ুন: সড়ক পার হতে গিয়ে ট্রাকচাপায় বিজিবি সদস্য নিহত
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম। গ্লোরি টেক্সটাইলের ইউটিলিটি ব্যবস্থাপক সোহেল আহাম্মেদ জানান, দেড় থেকে দুই মাস ধরে নির্ধারিত ১৫ পিএসআইয়ের পরিবর্তে প্রায় ১০ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
শেফার্ড গ্রুপের জিএম মোকলেছুর রহমান বলেন, তাঁদের কারখানাটি শতভাগ রপ্তানিমুখী। গ্যাস সংকটে উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এতে পণ্যের কাঙ্ক্ষিত রং পাওয়া যাচ্ছে না এবং নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন ও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে ক্রেতাদের সঙ্গে করা চুক্তি ভঙ্গের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এবং শ্রমিকদের বেতন দিতেও সমস্যা হচ্ছে।
টি এম টেক্সটাইলের জেনারেল ম্যানেজার দুর্জয় কুমার সাহা বলেন, গ্যাসের চাপ না থাকায় ধাপে ধাপে তাঁদের অর্ধেক সেকশন ছুটি দিতে হয়েছে। বয়লার, ডাইং ও ফিনিশিং ইঞ্জিন গ্যাসে চলে। গ্যাস না থাকায় উৎপাদন কমে গেছে। কারখানাটিতে সাড়ে পাঁচ হাজার শ্রমিক রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরেজমিনে জানা গেছে, ভালুকার বিভিন্ন ইউনিয়নে ছোট-বড় সাড়ে তিন শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯০টি কারখানায় গ্যাস সংযোগ রয়েছে। প্রায় ৩০টি ডাইং কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আর্টি কম্পোজিট, গ্লোরি স্পিনিং মিল, লাবিব মিল, কনজিউমার নিটেক্স লিমিটেড, টিএম টেক্সটাইল ও শেফার্ড ইয়াং ডাইংসহ বিভিন্ন কারখানা দিনের বেলা গ্যাস পেলেও কম চাপের কারণে মেশিন চালাতে পারছে না। সংকটের প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন শিল্পকারখানার মালিক ও ব্যবস্থাপক তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে আবেদন করেছেন।
গ্যাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কারখানা চালানোর পাশাপাশি সংকটের সময় ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করা হতো। তবে গ্যাস সংকটের সঙ্গে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এস এন এস সিএনজি ফিলিং স্টেশনের পরিচালক সুমন আহাম্মেদ বলেন, রাতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না এবং দিনের বেলাতেও চাপ কম।
সংশ্লিষ্ট শিল্পমালিক ও শ্রমিকদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন আরও কমে গেলে কারখানাগুলোতে কর্মসংস্থান ও শ্রমিকদের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভালুকার শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।





