‘ধর্মীয় কারণ নয়’, নদীভাঙন ও কৃষকের ধান রক্ষায় নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৫:৫৪ অপরাহ্ন, ২২ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৭:৫২ অপরাহ্ন, ২২ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুনাই নদীতে আগামী ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠেয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদী জনতা’ নামের একটি পক্ষ। কয়েকটি গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

তবে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে থাকা একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, এ দাবির পেছনে ধর্মীয় কোনো কারণ নেই। নদীভাঙন রোধ, কৃষকদের ধান রক্ষা এবং নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতেই তারা আয়োজনটি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন: গাজীপুরের উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয় সদস্যদের

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন মাসুম বিন নুর উদ্দিন নামের এক যুবক। তিনি গত ১৮ আগস্ট রাত ৭টা ২৯ মিনিটে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্টার শেয়ার করেন। সেখানে প্রথম ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নামটি দেখা যায়।

পরে রাত ৮টা ৯ মিনিটে পোস্টটি সম্পাদনা করে আরেকটি পোস্টার যুক্ত করা হয়। সেখানে লেখা ছিল, ‘সুনাই নদীতে আগত নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা।’ একই পোস্টারে সবাইকে ঈমানি দায়িত্ববোধে সভায় উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

আরও পড়ুন: সিলেটে ট্যাংকলরি-অটোরিকশা সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজনসহ নিহত ৪

তবে মাসুম বিন নুর উদ্দিন শনিবার (২২ আগস্ট) কালবেলা অনলাইনকে বলেন, দ্বিতীয় পোস্টারে ‘নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা’ লেখা ভুল হয়েছিল। তিনি ব্যক্তিগতভাবে নৌকাবাইচ বন্ধ চান এবং এর কারণ হিসেবে নদীভাঙন ও কৃষকদের ক্ষতির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, বিষয়টির সঙ্গে ধর্মীয় কোনো সম্পর্ক নেই।

কালবেলার সঙ্গে কথা বলার পর তিনি পোস্টারটি ফেসবুক থেকে সরিয়ে নেন। তাঁর ভাষ্য, পরামর্শ সভার আয়োজকেরা তাঁকে পোস্টারটি তৈরি করতে বলেছিলেন।

গত ২০ আগস্ট বারিগ্রাম বাজার মসজিদে এ বিষয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে মাসুম বিন নুর উদ্দিন একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ‘মুক্ত বাতাস’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ওই ভিডিওটি তিনিই পরিচালনা করেন বলে জানা গেছে।

ভিডিওতে স্থানীয় আলেম ও মুরব্বিদের বক্তব্য রয়েছে। সেখানে নদীভাঙন, কৃষকদের ধান রক্ষা এবং সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে আসে। কয়েকজন বক্তা ধর্মীয় অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেন। নৌকাবাইচকে সরাসরি ধর্মবিরোধী হিসেবে উল্লেখ করা না হলেও আয়োজনকে কেন্দ্র করে জুয়ার আসর বসার অভিযোগ তুলে সেটিকে হারাম বলা হয়।

প্রবীণ আলেম মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক কালবেলাকে বলেন, বিষয়টি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়; বরং সামাজিক ও জনস্বার্থের বিষয়। ‘তৌহিদী জনতা’ কিংবা নাগরিক সমাজের নামে কারা ব্যানার করেছে, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন। তবে এলাকার সচেতন নাগরিকদের মূল দাবি হলো, ওই অঞ্চলে আর নৌকাবাইচ আয়োজন না করা।

তিনি বলেন, অতীতে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দুই নৌকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেকে আহত হয়েছেন। এ ছাড়া নৌকাবাইচের পাশের এলাকায় গানের আসরকে কেন্দ্র করে গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে। এ কারণে বড় ধরনের আয়োজনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি জানান।

এদিকে, নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির বিপরীতেও অবস্থান রয়েছে স্থানীয়দের একটি অংশের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি কালবেলাকে বলেন, নৌকাবাইচের কারণে নদীর কোনো ক্ষতি হবে না। আয়োজন ঘিরে কোনো অনিয়ম হলে প্রশাসন তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাদের মতে, এটি এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন এবং তা বন্ধের দাবি অযৌক্তিক।

ফলে সুনাই নদীতে আগামী ২৮ আগস্টের নৌকাবাইচ ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। এক পক্ষ নদীভাঙন, কৃষকের ফসল রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় আয়োজনটি বন্ধের দাবি জানালেও অন্য পক্ষ এটিকে ঐতিহ্যবাহী আয়োজন হিসেবে চালু রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।