রায়পুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে জলাবদ্ধতা, ১৫২ ঘরে তালা; নষ্ট পানির কল-টয়লেট; নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা

Shahrier Islam Pallab
আব্দুল্লাহ আল মামুন,রায়পুর(লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১১:১৮ পূর্বাহ্ন, ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:৫৩ পূর্বাহ্ন, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

অসহায় ও ভূমিহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় নির্মাণ করা হয়েছে ৪৬৭টি ঘর। কিন্তু এসব ঘরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ১৫২টি ঘরে কেউ বসবাস করছেন না; ঝুলছে তালা। কোথাও আবার জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা টয়লেট, নষ্ট পানির কল ও ডিপটিউবওয়েলের কারণে দুর্ভোগে রয়েছেন বসবাসকারীরা।

এদিকে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বাদ দিয়ে সচ্ছল ব্যক্তি এবং জনপ্রতিনিধিদের স্বজনদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘর বরাদ্দ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়া এবং ঘরের জায়গা ভরাটে উপকারভোগীদের বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন।

আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় লালন শাহের মাজারে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ

সম্প্রতি সরজমিনে উপজেলার বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজার, দক্ষিণ চরবংশীর মিয়ারহাট ও খলিফারহাট, উত্তর চরবংশীর মদিনাবাজার ও কুচিয়ামারা এবং হাজিমারা এলাকার কয়েকটি আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে। কোনো কোনো ঘরের দরজায় ঝুলছে তালা। আবার কোথাও বসবাসকারীরা ঘরের আশপাশে জলাবদ্ধতার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছেন না। কয়েকটি স্থানে পুকুরের ঘাট ভেঙে পড়েছে। পুকুরপাড়ের কিছু ঘরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় কোনো কোনো আশ্রয়ণকেন্দ্রে টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথাও পানির কল নষ্ট, আবার কোথাও ডিপটিউবওয়েল নষ্ট বা চুরি হয়ে গেছে। ফলে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বাসিন্দাদের। উপকারভোগীদের কয়েকজন জানান, আশ্রয়ণকেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। অনেক সময় দূরের স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। পুকুর থাকলেও ঘাট ভাঙা থাকায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের বেশি সমস্যায় পড়তে হয়।

আরও পড়ুন: নিকলীতে ১৪ পিস ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, রায়পুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় মোট ৪৬৭টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৩টি ঘরে মানুষ বসবাস করছেন। বাকি ১৫২টি ঘর দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ রয়েছে।

ঘরগুলোর মধ্যে বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজারে ৯৪টি, শিবপুরে ১০টি, কেরোয়ার মীরগঞ্জে ৯টি, দক্ষিণ চরবংশীর মিয়ারহাটে ৪৫টি, হাজিমারায় ৪৪টি, কারিমিয়ায় ১১৭টি, উত্তর চরবংশীর কুচিয়ামারায় ২৪টি, মদিনাবাজারে ৪৩টি এবং দক্ষিণ চরআবাবিলের উদমারায় ৭৯টি ঘর রয়েছে।

তালাবদ্ধ ১৫২টি ঘরের মধ্যে বাংলাবাজারে ৪০টি, মিয়ারহাটে ১৪টি, হাজিমারায় ১৪টি, মদিনাবাজারে ১৩টি, কুচিয়ামারায় ৮টি, উদমারায় ১১টি এবং কারিমিয়ায় ৩২টি রয়েছে।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের কয়েকটি আশ্রয়ণকেন্দ্রে এমন ব্যক্তিদেরও ঘর দেওয়া হয়েছে, যাদের নিজেদের বসতভিটা ও ঘরবাড়ি রয়েছে।

এ ছাড়া জনপ্রতিনিধিদের স্বজনদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ঘর দেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের যাচাই-বাছাই যথাযথভাবে না হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ইউপি সদস্যদের কেউ কেউ কারও কাছ থেকে ৬ হাজার, আবার কারও কাছ থেকে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন। 

এ ছাড়া ঘরের জায়গা ভরাটের সময় উপকারভোগী পরিবারের সদস্যদের বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দিতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা

তবে অভিযোগ অস্বীকার না করে দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু সালেহ মিন্টু ফরাজি বলেন, বরাদ্দের সময় মাটি ভরাট এবং ঘরের মেঝে ও বারান্দার কাজের জন্য উপকারভোগীদের কাছ থেকে ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। নিজেদের ঘরের কাজ হওয়ায় অনেকে নিজেরাই শ্রম দিয়েছেন। আর দলিল রেজিস্ট্রির জন্য ভূমি অফিস ১ হাজার ২০০ টাকা করে নিয়েছে। 

আশ্রয়ণকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন কয়েকজন বাসিন্দা। তাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর কয়েকটি আশ্রয়ণকেন্দ্রে বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়ে যায়। কোথাও কোথাও মাদকের আড্ডা বসে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে কয়েকজন বাসিন্দা লাঞ্ছিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। ফলে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন অনেক পরিবার।তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

রায়পুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেশ কিছু ঘরে বর্তমানে কেউ বসবাস করছেন না। এসব ঘর নতুন করে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে।

রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২টি ঘর তালাবদ্ধ থাকার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। তালিকায় কোনো সচ্ছল ব্যক্তির নাম থাকলে তা যাচাই করে বাদ দেওয়া হবে। এরপর প্রকৃত গৃহহীন ও ভূমিহীনদের মধ্যে এসব ঘর বরাদ্দ দেওয়া হবে।  তিনি আরও বলেন, আশ্রয়ণকেন্দ্রগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি খাসজমিতে প্রায় ৫০০ বর্গফুট জায়গার ওপর প্রতিটি আশ্রয়ণ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ঘরে রয়েছে দুটি শয়নকক্ষ, রান্নাঘর, ইউটিলিটি রুম, টয়লেট ও বারান্দা। দুর্যোগসহনীয় এসব ঘরে সোলার সিস্টেম ও বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রতিটি সেমিপাকা ঘরের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা।

অসহায় মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও নির্মিত ঘরের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ থাকা, কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও পানি ও পয়োনিষ্কাশনের সংকট এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ প্রকল্পের বাস্তব ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।  স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত আশ্রয়ণকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে প্রকৃত চিত্র বের করতে হবে। তালাবদ্ধ ঘরগুলো যাচাই করে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মধ্যে বরাদ্দ দিতে হবে। পাশাপাশি নষ্ট পানির কল, ডিপটিউবওয়েল, টয়লেট, পুকুরের ঘাট ও জলাবদ্ধতার সমস্যা দ্রুত সমাধান এবং আশ্রয়ণকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তাদের প্রত্যাশা, সরকারি অর্থে নির্মিত এসব ঘর যেন খালি পড়ে না থাকে; বরং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী প্রকৃত অসহায় মানুষের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখে।