এলপিজি সিলিন্ডার নৈরাজ্যের সঙ্গে দামও বাড়ল

Sanchoy Biswas
শামসুজ্জামান শামস
প্রকাশিত: ১০:৪০ অপরাহ্ন, ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:০৬ পূর্বাহ্ন, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চুলা জ্বললে তবেই হাঁড়ি চড়ে, আর সেই হাঁড়ির অন্ন জুগিয়েই বেঁচে থাকে এদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। কিন্তু  বেশ কয়েকদিন ধরে সেই আগুনেই যেন পুড়ছে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে রান্নাঘরের বাতাস। নতুন করে এলপিজি সিলিন্ডার আর অটোগ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিটি টাকা যেন সাধারণ মানুষের পকেট কাটার একেকটি নিষ্ঠুর আঘাত। 

আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত আর সিন্ডিকেটের নির্মম খেলায় পিষ্ট হয়ে মধ্যবিত্তের ডাল-ভাতের স্বপ্নটাও ধোঁয়া হয়ে উড়ে যাচ্ছে। যখন একটি সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে একজন বাবাকে সন্তানের পড়াশোনার খরচ কিংবা মায়ের ওষুধের টাকা কাটছাঁট করতে হয়, তখন এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি সংখ্যার পরিবর্তন থাকে না—তা হয়ে ওঠে কোটি মানুষের বেঁচে থাকার এক নীরব হাহাকার। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এলপিজির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গত ১০ দিন ধরে বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সংকটের মধ্যে খোলা বাজারে গতকাল ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকায় বক্রি হয়েছে। 

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ থেকে প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার শ্রমিক নেবে মালয়েশিয়া

প্রতিমাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম, জাহাজভাড়া, ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়াম, ডলারের বিনিময় হারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। এবার আমদানিকারকদের দেওয়া প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় এলপিজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে—এমন ধারণা আগে থেকেই ছিল। গত মাসে নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে এবার ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে এক মাসের ব্যবধানে এলপিজির দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে বিইআরসি নির্ধারিত দামের সঙ্গে খুচরা বাজারের দামের বড় ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও বাজারে একই সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হলে ভোক্তাকে নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ৫৬৩ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। 

সরবরাহ সংকট ও বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগের মধ্যেই ১২ কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বেসরকারি খাতের ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। 

আরও পড়ুন: প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন দর কার্যকর হয়েছে বলে বিইআরসি থেকে জানানো হয়। নতুন দর ঘোষণা করে বিইআরসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়ায় দেশের বাজারেও দাম সমন্বয় করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে কমিশন। এলপিজির সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। অক্টোবর মাসের জন্য নতুন দাম ঘোষণা করেছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অটোগ্যাসের দাম বাড়িয়ে লিটারপ্রতি করা হয়েছে ৮৪ টাকা। যা আগে ছিল  ৭৩ টাকা ৯ পয়সা। রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে থেকেই নতুন দাম কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে এনার্জি  রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। 

বলা হয়েছে, পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১২ কেজি এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। পরে ভ্যাট কমায় ১৫ টাকা কমে দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৪১ টাকা। মার্চে অপরিবর্তিত থাকার পর এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বেড়ে দাম ১ হাজার ৯৪০ টাকায় ওঠে। এরপর জুনে ৫৫ টাকা এবং জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়। আগস্টে আবার ৭০ টাকা বেড়ে দাম হয় ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। সেপ্টেম্বরে ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এক মাসের ব্যবধানেই এবার সেই দাম আবার ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হলো। নতুন দর এমন সময়ে ঘোষণা করা হলো, যখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজির সিলিন্ডারের সংকট চলছে। বাড়তি দাম দিয়েও কোথাও কোথাও গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ফলে নতুন দর ঘোষণার পর বাজারে ভোক্তার ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে ১২ আমদানিকারকের সেপ্টেম্বর মাসের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়েছে বিইআরসি। গত শনিবার চিঠি দিয়ে রবিবারের মধ্যে এসব তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। 

চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছ থেকে পাওয়া আমদানির তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, আমদানি ও বিক্রির তথ্য পাওয়ার পর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির অভিযোগ, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে আমদানিকারকরা সরবরাহ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে দেন। ২৫ সেপ্টেম্বরের পর কয়েকটি ডিপো থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তবে আমদানিকারকরা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, তারা বিইআরসির নির্ধারিত দামেই ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে এলপিজি সরবরাহ করছেন। তাদের দাবি, আমদানিকারক পর্যায়ে কোনো কৃ ত্রিম সংকট তৈরি করা হয়নি। এর আগে গত শনিবার জ্বালানি মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও আমদানিকারকরা একই দাবি করেন। 

তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি ও জাহাজভাড়া বাড়লেও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন তারা। বাজারে কারসাজি হয়ে থাকলে তা ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে হতে পারে বলে তাদের দাবি। ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল দেশে প্রথমবার এলপিজির মাসভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সময় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ৯৭৫ টাকা। এরপর কখনও দাম বেড়েছে, কখনও কমেছে। তবে কমার তুলনায় বাড়ার প্রবণতাই বেশি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়লেও যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা কমে আসে। এরপর কয়েক মাস ধরে বাজারে দামের ওঠানামা চলছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বয় করেই দেশের বাজারে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিইআরসি। যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দাম লিটারে প্রায় ১২ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে অটোগ্যাসের প্রতি লিটারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা। 

গতকাল রবিবার বিকেলে এক বিজ্ঞপ্তিতে অটোগ্যাস ও এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ঘোষণা করে বিইআরসি। নতুন এই দাম গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকেই কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। বিইআরসির সচিব মো. নজরুল ইসলাম সরকারের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অক্টোবর, ২০২৬ মাসের জন্য সৌদি আরামকো কর্ত ৃক প্রোপেন এবং বিউটেনের ঘোষিত সৌদি সিপি প্রতি মেট্রিক টন যথাক্রমে ৬৮০ মার্কিন ডলার এবং ৭৩০ মার্কিন ডলার এবং প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫ অনুযায়ী প্রোপেন ও বিউটেনের গড় সৌদি সিপি প্রতি মেট্রিক টন ৭১২.৫০ মার্কিন ডলার বিবেচনায় অক্টোবর, ২০১৬ মাসের জন্য বেসরকারি এলপিজি ও অটোগ্যাসের ভোক্তাপর্যায়ের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে চরম নৈরাজ্য চলছে, বিশেষ করে কোম্পানি ও দোকানভেদে প্রতিটি সিলিন্ডারে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ২৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া হচ্ছে। তবে বিক্রেতাদের দাবি, বাজারে গ্যাসের সরবরাহে সংকট রয়েছে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার পর্যাপ্ত থাকলেও বেশির ভাগ দোকানে প্রয়োজনীয় গ্যাস মিলছে না। আবার কোথাও বেশি দাম দিয়েও কাঙ্ক্ষিত সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে রান্নার কাজে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।   বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ খুচরা বাজারে একই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ ভোক্তাকে সিলিন্ডারপ্রতি বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়েও সহজে মিলছে না সিলিন্ডার। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খুচরা দোকানে সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে বিক্রেতাদের সঙ্গে গ্রাহকদের বাকবিতণ্ডায় জড়ানোর ঘটনা ঘটছে। বিক্রেতারা বলছেন, তারা নিজেরাই পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছেন না। বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে ভোক্তাদের প্রশ্ন, সরবরাহ সংকট থাকলে একই পণ্য বেশি দামে কীভাবে পাওয়া যাচ্ছে এবং নির্ধারিত দামে কেন মিলছে না। রাজধানীর লালবাগ এলাকার বাসিন্দা নাহিদা বেগম কয়েক বছর ধরে সেখানে ভাড়া থাকেন। বাসায় পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ থাকলেও নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় চুলা জ্বলে না। বাধ্য হয়ে রান্নার কাজে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাকে। নবাবপুরের আছিয়া বেগমের মতো লাখো পরিবারের জন্য রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি হয়ে উঠেছে এলপিজি। কিন্তু বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে ক্ষুব্ধ তিনি। 

তেজগাঁও রেলগেটের পাশে চা বিক্রেতা আবদুর রহমান জানান, সম্প্রতি তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছিলেন ১ হাজার ৬০০ টাকায়। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একই সিলিন্ডারের জন্য তাকে দিতে হয়েছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। এখন সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, সব কোম্পানির গ্যাসেরই সরবরাহ কম; বিশেষ করে বসুন্ধরা কোম্পানির সরবরাহ একদমই কম বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, দেড় মাস আগেও এসব সিলিন্ডার ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। হঠাৎ করে দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী জাহিদ রহমান জানান, তিনি সেনা গ্যাস ১ হাজার ৮০০ টাকায় কিনে ১ হাজার ৮৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। কাপ্তানবাজারের  ভোক্তা আব্দুল সাত্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোম্পানিগুলোর কম সরবরাহের অজুহাত দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো বেশি দাম নিচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, সিলিন্ডারে গ্যাসও ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে। ভোক্তাদের দাবি, বাজার মনিটরিং জোরদার করে অবিলম্বে এই সিন্ডিকেট ও নৈরাজ্য বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্ত ৃপক্ষের হস্তক্ষেপ জরুরি। টঙ্গীর তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রেতা মো. ফজল মিয়া। ছোট দোকানে বিভিন্ন কোম্পানির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করেন। গতকাল রবিবার সকালে ক্রেতা সেজে তার কাছে সিলিন্ডার কিনতে চেয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক। তবে প্রথমে ‘সিলিন্ডার নেই’ বলে সাফ জানিয়ে দেন। কিন্তু ‘গ্যাস না থাকায় বাসায় রান্না হচ্ছে না, যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে দেন’— বলার পর ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ টাকা দাম চান। 

এই বিক্রেতা বলেন, সিলিন্ডার এমনিতেই নেই। দাম ২ হাজার ৪০০ টাকা দেবেন। দেখি যদি ম্যানেজ করে দিতে পারি। বিকেলে একবার ফোন দিয়েন। এমন বাড়তি দামে সিলিন্ডার বিক্রির চিত্র রাজধানীর আশপাশের এলাকাসহ সারাদেশেই। অথচ ১২ কেজির এই সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ নির্ধারিত এই দামে সিলিন্ডার বিক্রির নজির কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘সিলিন্ডার নেই’ অজুহাত। এদিন সকালে রাজধানীর আজিমপুর, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সিলিন্ডার গ্যাসের খুচরা দোকান বন্ধ পাওয়া যায়। আর যেসব দোকানে অন্যান্য জিনিসপত্রের সঙ্গে সিলিন্ডার বিক্রি করা হয় সেসব দোকানেও সিলিন্ডার নেই। আজিমপুরের এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, সিলিন্ডার দেওয়া যাবে, তবে ২ হাজার ৫০০ টাকা পড়বে। নতুন বোতলসহ কিনলে ৪ হাজার টাকা দিতে হবে। ‘বাংলাদেশ এলপিজি সিলিন্ডার এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট গ্রুপ’ একটি ফেসবুক গ্রুপ। গ্রুপটিতে অনেকেই সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রির তথ্য দিয়ে থাকেন। অনেক ক্রেতাও তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। গ্রুপে সুমাইয়া ইসলাম নামের একজন লিখেছেন, দেশটা আসলে যাচ্ছে কোথায়? আজকে বসুন্ধরার ২ টা এলপি গ্যাস নিয়ে আসলাম ৪ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে। ১টি ২ হাজার ৪৫০ টাকা করে, চিন্তা করেন। যেই গ্যাস ক্রয় করতাম ১২০০/১৪০০ টাকা, আজ সেই গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া। আমরা সাধারণ মানুষ কী করবো? আমাদের কি মেরে ফেলতে চান? দিনশেষে সাধারণ মানুষের চাওয়াগুলো তো খুব বড় কিছু নয়—একটু শান্তিতে দুমুঠো খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা। কিন্তু সিলিন্ডার আর অটোগ্যাসের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি তাদের সেই অতি সাধারণ অধিকারটুকুকেও এক দুঃসাধ্য বিলাসে পরিণত করেছে। ডাল-ভাতের হিসাব মেলাতে মেলাতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া মানুষগুলো আজ আর আন্তর্জাতিক বাজারের জটিল সমীকরণ বোঝে না, তারা শুধু বোঝে মাস শেষে তাদের শূন্য পকেট আর অসহায়ত্বের তীব্র যন্ত্রণা। এই নীরব হাহাকার আর কতদিন? আর কতকাল সিন্ডিকেটের লোভের আগুনে পুড়বে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন? এখন সময় এসেছে এই নির্মম নৈরাজ্যের অবসান ঘটানোর। কাগজের কলমে দাম নির্ধারণের চেয়েও বেশি প্রয়োজন এক বুক অসহায়ত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওই সাধারণ মানুষগুলোর মুখে একটু স্বস্তির হাসি ফোটানো। কারণ, যে আগুন মানুষের রান্নাঘরকে বাঁচিয়ে রাখার কথা, তা যদি প্রতিনিয়ত তাদের জীবনকেই পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়—তবে সেই আগুনের চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছুই হতে পারে নেই।