দলীয় মনোনয়ন পেতে তৎপর সম্ভাব্য প্রার্থীরা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সরব নেতাকর্মীরা
কুমিল্লা সিটি নির্বাচন ঘিরে আগাম প্রচারণা
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচন ঘিরে আগেভাগেই রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এখনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা হয়নি। তবে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের জনসংযোগ, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণায় নগরীতে এরই মধ্যে নির্বাচনি আমেজ তৈরি হয়েছে।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—তিন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়েই নগরীর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। কেউ দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য সাংগঠনিকভাবে তৎপর, আবার কেউ ভোটারদের সঙ্গে আগাম যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। তবে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা এখনো প্রকাশ হয়নি।
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় লালন শাহের মাজারে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সরকারি ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে খসড়া ভোটকেন্দ্রের তালিকা-সংক্রান্ত গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তথ্য রয়েছে।
বিএনপিতে একাধিক নাম
আরও পড়ুন: নিকলীতে ১৪ পিস ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
কুসিক নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু। প্রশাসক হিসেবে নগরীর কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় রয়েছেন তিনি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় মহানগর বিএনপির সদস্য কাউসার জামান বাপ্পির নামও সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে এসেছে।
অন্যদিকে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার ও সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুও দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন। দুজনই অতীতে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তারা বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য দলীয় হাইকমান্ডের কাছে আবেদন করেছেন বলে জানিয়েছেন।
ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, দল ও দলের প্রধান যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তিনি তা মেনে চলবেন। বর্তমানে তিনি নগরবাসীর সেবায় ব্যস্ত রয়েছেন। প্রার্থিতার সিদ্ধান্ত দলীয় হাইকমান্ড থেকেই আসবে।
নিজাম উদ্দিন কায়সারের ভাষ্য, বহিষ্কৃত হলেও তিনি দলের বাইরে নন। অতীতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাপের মুখে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। দল বিষয়টি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে বলে তিনি আশা করেন।
মনিরুল হক সাক্কুও জানিয়েছেন, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য দলের হাইকমান্ডের কাছে আবেদন করেছেন। দলের জন্য নিয়মিত কাজ করছেন এবং ভবিষ্যতে কর্মী-সমর্থকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এগিয়ে যাবেন।
জামায়াতে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা
কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী থেকেও সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছে। মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির মোসলেহ উদ্দিন এবং শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. মজিবুর রহমান ভূঁইয়ার নাম আলোচনায় রয়েছে।
তবে দলীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন জামায়াত নেতারা। মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি কামরুজ্জামান সোহেল জানান, দল যাকে প্রার্থী হিসেবে সিদ্ধান্ত দেবে, তিনিই নির্বাচনে অংশ নেবেন। বর্তমানে দলীয় প্রার্থীকে জয়ী করার লক্ষ্যে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চলছে।
মাঠে এনসিপির তারিকুল
বিএনপি ও জামায়াত যেখানে প্রার্থী বাছাই নিয়ে তৎপর, সেখানে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আগেই কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলামের নাম ঘোষণা করেছে। এপ্রিলে দলটি তাকে প্রার্থী ঘোষণা করে এবং তিনি কুমিল্লা সিটিতে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানান।
দলীয় ঘোষণার পর তারিকুল ইসলাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। সেপ্টেম্বর মাসে তিনি মুরাদনগর উপজেলার ভোটার তালিকা থেকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
তারিকুল ইসলাম বলেন, নগরবাসীর সেবা করার জন্য তিনি প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। গণসংযোগের মাধ্যমে নগরবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ ও সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করছেন।
ভোটের পুরোনো হিসাবও আলোচনায়
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের আগের নির্বাচনগুলোর ফলও এবারের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণে আলোচনায় আসছে।
২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রথম কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে মনিরুল হক সাক্কু ৬৫ হাজার ৫৭৭ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আফজল খান পেয়েছিলেন ৩৬ হাজার ৪৭১ ভোট।
২০১৭ সালের নির্বাচনে মনিরুল হক সাক্কু বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আঞ্জুম সুলতানা সীমা পান ৫৭ হাজার ৮৬৩ ভোট।
২০২২ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত আরফানুল হক রিফাত ৫০ হাজার ৩১০ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু পান ৪৯ হাজার ৯৬৭ ভোট। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার পান ২৯ হাজার ৯৯ ভোট। মাত্র ৩৪৩ ভোটের ব্যবধানে রিফাত জয়ী হন।
পরবর্তীতে আরফানুল হক রিফাতের মৃত্যুর পর ২০২৪ সালের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের তাহসীন বাহার সূচনা মেয়র নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে সাক্কু পান ২৬ হাজার ৮৯৭ ভোট এবং নিজাম উদ্দিন কায়সার পান ১৩ হাজার ১৫৫ ভোট।
একক প্রার্থী নিয়েই আগ্রহ
আগের নির্বাচনগুলোর ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কুমিল্লা সিটিতে একই রাজনৈতিক ঘরানার একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভোটের হিসাবেও তার প্রভাব পড়েছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে সাক্কু ও কায়সার পৃথকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং দুজনের সম্মিলিত ভোট ছিল ৭৯ হাজার ৬৬৬। একই নির্বাচনে রিফাত জয়ী হন ৫০ হাজার ৩১০ ভোট নিয়ে।
এ কারণে এবারের নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে শেষ পর্যন্ত একজন প্রার্থী দেওয়া হয় কি না, দলটির বহিষ্কৃত দুই নেতার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে এবং জামায়াত ও এনসিপির কৌশল কী হয়—এসব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত কোনো প্রার্থীর অবস্থানকে নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।
তফসিলের অপেক্ষায় নগরবাসী
এখনো কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণা হয়নি। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারি পর্যায়ে প্রস্তুতির কিছু কার্যক্রম এগোচ্ছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে খসড়া ভোটকেন্দ্রের তালিকা নিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়ায় নগরীর রাজনৈতিক পরিবেশে নির্বাচনি আলোচনা জোরালো হচ্ছে। এখন নজর দলীয় মনোনয়ন, প্রার্থী চূড়ান্তকরণ এবং শেষ পর্যন্ত কোন দল কী ধরনের নির্বাচনি কৌশল গ্রহণ করে—সেদিকে।





