পাহাড়, স্বচ্ছ জল আর সাদা পাথরের মায়াবী সৌন্দর্যে মুগ্ধ পর্যটকেরা
পূজার ছুটিতে সাদাপাথরে পর্যটকের ঢল
চারদিকে সাদা পাথরের বিস্তীর্ণ প্রান্তর, স্বচ্ছ জলের প্রবাহ আর দিগন্তজুড়ে ভারতের মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়—প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরে আসা পর্যটকেরা। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা পানির স্রোত, পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ জল আর পাহাড়ঘেরা মনোরম পরিবেশ মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয় নাগরিক জীবনের ক্লান্তি। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে কিছুটা প্রশান্তির খোঁজে এখানে ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে সাদাপাথর যেন পরিণত হয়েছে পর্যটকদের মিলনমেলায়। কেউ স্বচ্ছ জলে নেমে উপভোগ করছেন প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, কেউ প্রিয়জনদের সঙ্গে ছবি তুলে ধরে রাখছেন ভ্রমণের স্মৃতি, আবার কেউ মুগ্ধ চোখে দেখছেন পাহাড়, পাথর আর জলের অপূর্ব মিতালি।
আরও পড়ুন: সোনারগাঁয়ে দুর্বৃত্তের হামলায় যুবদল নেতা নিহত
শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো পর্যটনকেন্দ্র। পূজার ছুটিতে পর্যটকদের এমন উপচেপড়া ভিড়ে বেড়েছে স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততাও। পর্যটকদের ছবি তুলতে ব্যস্ত ফটোগ্রাফার, নৌকা নিয়ে ছুটছেন মাঝিরা, আর ক্রেতাদের সেবা দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ঘাট এলাকার দোকানিরা। হোটেল ও রিসোর্টগুলোতেও বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এ বছর পূজার ছুটি এক দিন বেশি হওয়ায় পর্যটকদের উপস্থিতি বেড়েছে। ফলে পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তৈরি হয়েছে বাড়তি গতি।
পাহাড়ি ঢলে পাথর জমে, পরিচিতি পায় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে: সিলেট নগরী থেকে সড়কপথে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে অবস্থিত সাদাপাথর। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির সঙ্গে পাথরখণ্ড এসে জমা হওয়ায় ধলাই নদের উৎসমুখে গড়ে উঠেছে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকা। পাহাড়, নদী, স্বচ্ছ পানি ও পাথরের সমন্বয়ে সাদাপাথর পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন: শ্রীপুরে ভয়াবহ আগুনে পুড়ল মসজিদ, ঝুট-তুলার গুদাম ও দোকানপাট
২০১৭ সালের পাহাড়ি ঢলের পর এলাকাটিতে পাথরের বিস্তৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের নজর কাড়ে। পরবর্তী সময়ে স্থানটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। বর্তমানে সাদাপাথর সিলেটের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনগন্তব্য। সিলেট শহর থেকে সড়কপথে যাতায়াতের সুবিধা থাকায় ছুটির দিনগুলোতে এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে যায়।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্র ও ঘাট এলাকায় থানা-পুলিশ এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের তৎপরতা দেখা গেছে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিন মিয়া বলেন, “দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা সাদাপাথর বেড়াতে আসেন। পর্যটকেরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য ঘাটের ইজারাদার, নৌকার মাঝি, ফটোগ্রাফারসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।” কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওছমান গনি বলেন, “দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিবছরই সাদাপাথরে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকের পুলিশও দায়িত্ব পালন করবে।” ভোলাগঞ্জ ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, “পর্যটকদের নিরাপত্তায় কোনো কমতি রাখা হবে না। কেউ হয়রানি বা প্রতারণার শিকার হলে স্পটে দায়িত্বরত ট্যুরিস্ট পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে পারবেন। এ ছাড়া ১০ নম্বর ঘাটে আমাদের ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্স রয়েছে। সেখানে অভিযোগ জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পর্যটকদের সঙ্গে ভালো আচরণের নির্দেশনা ফটোগ্রাফারদের: সাদাপাথরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ক্যামেরায় ধারণ করতে পর্যটকদের পাশাপাশি ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় ফটোগ্রাফাররা। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় তাঁদের কাজের চাপও বেড়েছে। কোম্পানীগঞ্জ ফটোগ্রাফি সোসাইটির সভাপতি ফখরউদ্দিন বলেন, “আমাদের ফটোগ্রাফাররা সব সময় পর্যটকদের সঙ্গে বিনয়ী আচরণ করার চেষ্টা করেন। আমরা তাঁদের ভালো ছবি তোলার পাশাপাশি পর্যটকদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশনা দিয়েছি। কোনো ফটোগ্রাফার অসদাচরণ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে জানানোর অনুরোধ করছি।”
পর্যটকের চাপে রিসোর্ট ও দোকানপাটে ব্যস্ততা: পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট ও দোকানপাটে ব্যস্ততা বেড়েছে। পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ভোলাগঞ্জ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজার রামিম আহমদ বলেন, “আগের তুলনায় এ বছর পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। উন্নত সেবার মাধ্যমে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছি। আমাদের রিসোর্টে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এ বছর পর্যটকদের জন্য সুইমিংপুলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।” ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর ঘাট পর্যটন বাজার সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল বলেন, “আমরা দোকানিরা প্রতিদিন সকাল থেকে বিভিন্ন প্রসাধনী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসি। পর্যটকেরা নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী কেনাকাটা করেন। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে আমাদের ব্যবসাও ভালো হয়।”
নৌকাভাড়া ৮০০ টাকা, নৌপথ কমে হেঁটে যেতে হচ্ছে প্রায় এক কিলোমিটার: সাদাপাথরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে পর্যটকদের অন্যতম ভরসা ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর ঘাটের নৌকা। সরকার নির্ধারিত প্রতি নৌকার ভাড়া ৮০০ টাকা এবং একটি নৌকায় সর্বোচ্চ আটজন যাত্রী যেতে পারেন। তবে বালু ভরাটের কারণে আগের তুলনায় নৌপথের দূরত্ব কমে যাওয়ায় পর্যটকদের এখন নৌকা থেকে নেমে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে মূল স্পটে যেতে হচ্ছে। ঢাকা থেকে আসা এক পর্যটক জানান, এবছর শারদীয় পূজার ছুটিতে পর্যটকের চাপ বেশি থাকায় ঘাটে নৌকা পেতে তাঁকে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। আরেক পর্যটক জানান, দুই- বছর আগে বন্ধুদের নিয়ে সাদাপাথরে বেড়াতে এসে ঘাট থেকে নৌকায় প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মূল স্পটে পৌঁছেছিলেন। তখন নৌকায় যেতে সময় লাগত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট। এবার শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে দেখেন, নৌকায় যেতে সময় লাগছে ১০ থেকে ১২ মিনিট। এরপর প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে মূল স্পটে পৌঁছাতে হচ্ছে. ওই পর্যটক বলেন, “নৌকাভাড়া আগের মতোই ৮০০ টাকা রয়েছে। আগে নৌকায় ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট চলার পর মোটামুটি সরাসরি মূল স্পটে যাওয়া যেত, এখন নৌকায় ১০ থেকে ১২ মিনিট যাওয়ার পরও প্রায় এক কিলোমিটার পথ হাঁটতে হচ্ছে। বর্তমান যাতায়াতব্যবস্থা বিবেচনায় নৌকাভাড়া পুনর্বিবেচনা করা হলে পর্যটকেরা উপকৃত হবেন।” যেভাবে যাবেন সাদাপাথর: দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ট্রেনে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে এসে সেখান থেকে আম্বরখানা এলাকায় যাওয়া যায়। এ ছাড়া বাসে সিলেটের কদমতলী বাস টার্মিনালে এসে আম্বরখানা পয়েন্টে যাওয়া যায়। আম্বরখানা থেকে ভোলাগঞ্জের উদ্দেশে বাস, মিনিবাস, দোতলা বাস, ছাদখোলা বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে।স্থানীয়ভাবে জানানো ভাড়া অনুযায়ী, বাসে জনপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশায় জনপ্রতি প্রায় ১২০ টাকা খরচ হয়। ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর ঘাট থেকে সাদাপাথর যেতে একটি নৌকা রিজার্ভ নিতে সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৮০০ টাকা। প্রতিটি নৌকায় সর্বোচ্চ আটজন যাত্রী যেতে পারেন। কোথায় থাকবেন: সাদাপাথর ও ভোলাগঞ্জ এলাকায় কয়েকটি ছোট আবাসিক হোটেল রয়েছে। তুলনামূলক ভালো মানের আবাসনের জন্য রয়েছে সাদাপাথর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট। এ ছাড়া সিলেট শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। পর্যটকেরা নিজেদের বাজেট ও সুবিধা অনুযায়ী থাকার ব্যবস্থা বেছে নিতে পারেন।





